সর্বশেষ
|
প্রকাশ: শুক্রবার, আপডেট : ০৮ মে ২০২০ ০২:০৫ ঘণ্টা

জীবন বড় না ব্যবসা বড়? সিদ্ধান্ত পুণর্বিবেচনার দাবী

তাওহীদুল ইসলাম: 

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে দেশের মানুষ আতংক আর শংকা নিয়ে দিনাতিপাত করছে। আমাদের মতো সারা বিশ্বের মানুষ আতংকিত। অস্থির বিশ্বে প্রতিনিয়ত বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা, বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। বাংলাদেশে আক্রান্তের সংখ্যার হার প্রতিদিনই রেকর্ড ভাঙছে। অজানা নয়, একটা জানা আতংক নিয়ে সারা দিন কাটিয়ে অস্থির চিত্তে রাতে ঘুমাতে যায় মানুষ। সেই চেনা-জানা আতংক তথা করোনাভাইরাসের আতংক নিয়েই ঘুম ভাঙছে। প্রতিদিন দুপুর দুইটার দিকে সেই আতংক-শংকা এক নতুন রূপ ধারণ করে। চেনা-জানা আতংক তখন অজানা ভয়ে রূপ নেয়। না জানি একটু পর কোন খবর আসে। কারণ, সাধারণত প্রতিদিন দুইটা থেকে আড়াইটার মধ্যে করোনা পরিস্থিতি নিয়ে ব্রিফিং করা হয়।

 

গেল কয়েকদিন থেকে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। প্রতিদিন মৃত্যু তালিকায় যোগ হচ্ছে আরো কিছু সংখ্যা। মে মাসে এসে দেখা যাচ্ছে হু হু করে বাড়ছে সংখ্যা। এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালিকের সেই বক্তব্যের কথা স্মরণ করতে পারি। এপ্রিলের শেষ দিকে তিনি বলেছিলেন, মে মাস বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ; এই মাসেই করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা লাখের ঘরে পৌঁছাতে পারে। অবস্থা দৃষ্টে এমনটাই মনে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরাও সতর্ক করেছিলেন। বলেছিলেন, সামনের দিনগুলো হবে অনেক ঝুঁকিপূর্ণ। এ-ও বলেছিলেন, কেবল সচেতনতাই হতে পারে এই বিপদ থেকে মুক্তির পথ।

 

করোনা প্রতিরোধে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ  করা হয়েছে। যেমন: সামাজিক দূরত্ব বা শারীরিক দূরত্ব, মাস্ক পরা, নিজ নিজ গৃহে ঘরে অবস্থান করা ইত্যাদি। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সচেতনতামূলক পদক্ষেপ হচ্ছে ঘরে থাকা; এটাই সবচেয়ে নিরাপদ দিক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এটা বার বার গুরুত্ব দিয়ে বলছে। বাংলাদেশ সরকারও এমনটা বলছে বারংবার। সেটা পালনে সরকার নির্দেশনাও জারি করেছে এবং বাস্তবায়নে মাঠ পর্যায়ে কাজ অব্যাহত রেখেছে। সরকার কঠোর পদক্ষেপও নিয়েছে তথা সেনাবাহিনী মাঠে নামিয়েছে এই গৃহমুখীতা বাস্তবায়নের জন্য। এতো কিছুর পরও কিছু মানুষকে ঘরে রাখা সম্ভব হচ্ছিল না। কিছু মানুষ অভ্যাসের কারণে বের হচ্ছিল, আর কিছু মানুষ পেটের তাগিদে। দেশের বেশিরভাগ মানুষই দারিদ্র। তাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। এসব অসহায় দরিদ্র মানুষকে ঘরে রাখতে গিয়ে সরকার ইতিমধ্যে নানা ধরণের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। অসহায় মানুষের ঘরে ঘরে খাদ্য সামগ্রী পৌঁছিয়ে দিচ্ছে।

 

করোনা পরিস্থিতিতে শুরু থেকেই পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা সত্যিই প্রশংসনীয়। সেই শুরু থেকেই তারা নিজ উদ্যােগে সামাজিক দূরত্ব তথা সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি অসহায় হতদরিদ্র মানুষের ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছিয়ে দিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়া ব্যক্তি উদ্যোগেও অনেকেই সাহায্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই, মানুষকে ঘরে রাখা। আর ঘরে রাখতে পারলেই পৃথিবীব্যাপী যে মহামারি করোনা ভাইরাস তা থেকে নিজেদেরকে হেফাজত রাখা,দেশকে নিরাপদ রাখা সম্ভব।

 

সরকার যখন নিজেই নানাবিধ পদক্ষেপ নিচ্ছে ঘরে থাকা এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা নিশ্চিত করতে, তখনই আবার খোলে দেওয়া হলো পোষাক কারখানা গুলো, শর্তসাপেক্ষে। অথচ পোষাক কারখানা গুলো করোনার ডেঞ্জার জোন হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকায় অবস্থিত। এতে করে মানুষ সমালোচনা করতে শুরু করলো। মানুষ বললো, কারখানা খুললে মসজিদ উন্মুক্ত করতে অসুবিধে কোথায়? এ সমালোচনার মানে এই ছিল না যে, মসজিদগুলোও উন্মুক্ত করে দেয়া। এটার অর্থ ছিল, কারখানাগুলো করোনাপরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া পর্যন্ত যাতে বন্ধ রাখা হয়। আমরা কারখানা গুলো খোলার পর দেখলাম অনেকেই নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছে। দেখলাম, নামকাওয়াস্তে সরকারের দেয়া শর্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে কারখানা চালাচ্ছে। এতে করে মানুষ আরো আতংকিত হতে লাগলো।

 

তারপর এদেশের ব্যবসায়ী, গার্মেন্টস ও মিল-কারখানার মালিকরা সরকারের কাছে আবেদন জানালো শপিংমল/দোকান-পাট খুলে দেয়ার জন্য। কারণ, সারা বছরে একবারই কাপড় ব্যবসায়ীদের ব্যবসার মোক্ষম সময় তথা মাহে রামাদ্বান। এই মাসে ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে কেনাকাটার ধুম পড়ে যায়। সারা বছরে কাপড় ব্যবসায়ীদের যে ব্যবসা হয়, এ মাসেই তার বেশি হয়। সরকার বিষয়টি বিবেচনা করে কিছু শর্ত দিয়ে শপিংমল/দোকান খোলার ঘোষণা দিয়ে দিলো।

 

মন্ত্রীপরিষদ বিভাগের জারীকৃত এক আদেশে ১০মে থেকে সীমিত আকারে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত শপিং মল, মার্কেট, হাট-বাজার খোলা রাখতে বলা হয়েছে। এদিকে বিগত প্রায় দেড় মাস ধরে দেশে সাধারণ ছুটি চলছে। সাধারণ ছুটি চলাকালে মানুষকে ঘরে রাখতে দেশের আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন, সেনাবাহিনী প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। ভয়ংকর করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে দেশে শাটডাউন চলছে।

এ অবস্থায় শপিং মল, মার্কেট, হাঠ-বাজার গুলো উম্মুক্ত করে দেওয়ার ঘোষণায় সোমবার ৪ মে বিকেল থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় চলছে।

সাধারণ মানুষ নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে। সরকারের এমন সিদ্ধান্তে ব্যবসায়ীদের একটা অংশ খুশী হলেও অনেক ব্যবসায়ী কিন্তু আবার নাখোশ। অনেকেই বলছেন কিছুসংখ্যক ব্যবসায়ীর স্বার্থ দেখতে গিয়ে পুরো দেশকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে।

যেখানে দেশে করোনা সংক্রমণের হার দিন দিন বাড়ছে আশংকাজনক হারে, সেখানে এমন সিদ্ধান্ত আত্মঘাতি। এ অবস্থায় আরো কিছুদিন সারাদেশে শক্ত শাটডাউন থাকা উচিত ছিলো। সামাজিক ও শারীরিক দুরত্ব মানার ব্যাপারে সরকারি তৎপরতা আরো বাড়ানো প্রয়োজন ছিলো। মানুষকে জোর করে হলেও Stay Home অর্থাৎ ঘরে থাকতে বাধ্য করা যেতো। কিন্তু তা না করে সরকার শপিং মল, মার্কেট, হাট-বাজার গুলো খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, যা অপ্রত্যাশিত ছিল। সবাই বলছে, জীবন বড় নাকি জীবিকা বড়? নাকি ঈদের শপিং বড়? ঈদের শপিং কোন অত্যাবশ্যকীয় বিষয় নয়। এমনকি ধর্মীয় কোন অপরিহার্য বিষয়ও নয়। তবে কেন বিপনী বিতানগুলো, মার্কেটগুলো খোলে দেওয়ার এতো তোড়জোড়?

 

আজ বহু মানুষ কর্মহীন। দু’বেলা অন্ন যোগাতে অনেকের অবস্থা কাহিল হয়ে যাচ্ছে। মধ্যবিত্তরা কোন রকম দিনাতিপাত করছে। করোনাকালীন উপার্জনহীন এই সময়ে পরিবারের লোকজনের জন্য কিভাবে নতুন জামা কিনতে যাবে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষগুলাে? এরাই তো দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী।

 

অন্যদিকে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে কেনাকাটা করতে বলা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের পুলিশ বাহিনী কত নিরাপদে থেকে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাদের হাজারের মতো  সদস্য যেখানে আক্রান্ত এবং ইতোমধ্যে কয়েক জন মারাও গেছেন; সেখানে সাধারণ জনগণ কতটুকু নিরাপদ দুরত্ব বজায় রেখে শপিং করতে পারবে? এদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে শপিংমল/ দোকান খুলে দেয়ার ঘোষণার পর থেকে মসজিদ উন্মুক্ত করে দেয়ার জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জোর প্রচারণা চলে। জনগণের বক্তব্য, বাজার খুলে দিয়েছেন তাহলে মসজিদ উন্মুক্ত করে দিতে অসুবিধে কোথায়? মসজিদ হচ্ছে,মানুষের আবেগ-ভালবাসার জায়গা। সেই জায়গা থেকে মানুষ কথা বলেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখালেখি করেছে। মানুষের আবেগের কথায় সাড়া দিয়ে সরকার তরিৎ গতিতে সিদ্বান্ত নিয়ে শর্ত সাপেক্ষে মসজিদ উন্মুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছে। যে সব শর্তে মসজিদ উন্মুক্ত করার কথা বলা হয়েছে সে সব শর্ত পালন করা অনেক মসজিদের পক্ষেই কঠিন হবে। বিশেষ করে দূরত্বের যে বিষয়টি সেটি রক্ষা করা কঠিন। অনেক মসজিদ আছে কিছু কিছু ওয়াক্তের নামাজে মুসল্লী জায়গা দেয়াই কঠিন হয়ে পড়ে। ধরেন, জুম্মার নামাজ। এ নামাজে দূরত্ব বজায় রাখা নিয়ে বাকবিতণ্ডাও হতে পারে। অাবেগপ্রবণ অনেক মুসল্লী অাছেন, যারা বলবে কিসের দূরত্ব? মরলে মসজিদই মরবো। সে কারণে আমার ব্যক্তিগত মত, এ তিনটি সিদ্বান্তই আমাদের জন্য মঙ্গলজনক নয়। কারখানা বলেন, শপিংমল বলেন, আর মসজিদ উন্মুক্ত বলেন। এর কোনটাই সঠিক সিদ্বান্ত বলে মনে করিনা। জনগণ আবেগের জায়গা থেকে মসজিদ উন্মুক্ত করার কথা বলেছে; আর সরকার কারখানা বা শপিংমল খোলাকে জায়েজ করতে গিয়ে মসজিদ উন্মুক্ত করে দিয়েছে। এটা কাম্য ছিলো না।

 

অনেকে বলছেন, সরকার কত পদক্ষেপ নিয়েও মানুষকে ঘরে রাখতে পারছে না। এমতবস্থায় যার ইচ্ছা সে মার্কেট করতে যাক, অসুবিধে কোথায়? হ্যা,অসুবিধে আছে। অনেকে নিয়ম-বিধি মানে না বলেই তো আইন প্রয়োগ করতে হয়। এই কারণে অাইনশৃঙ্খলা বাহিনী, আদালত, কারাগার। না হয় এগুলোর কী প্রয়োজন ছিল? একটা বিষয় চিন্তা করে পাই না, সরকারের পক্ষ থেকে যেখানে মে মাসকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হলো, যেখানে লক্ষাধিক জনগণ সংক্রমিত হওয়ার আশংকা করা হলো, যেখানে সে ধারণা মোতাবেক প্রতিনিয়ত সংক্রমণের সংখ্যাও বাড়ছে; সেখানে হুট করে কারখানা, তারপর শপিংমল আবার মসজিদ উন্মুক্ত করে দেওয়ার মাজেযা কী? এমন সিদ্ধান্ত কার স্বার্থে নেয়া হচ্ছে বুঝে আসে না?

 

সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলের কাছে অনুরোধ রাখবো, দেশের সাধারণ মানুষের হৃদয়ের আওয়াজ শুনতে চেষ্টা করুন। একটু ভেবে দেখুন, শপিং মল, মার্কেট, হাট বাজার খোলা রাখার সিদ্ধান্ত প্রদান কতটুকু যৌক্তিক হয়েছে? আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসুন খুব দ্রুত, পুনর্বিবেচনা করুন এমন সিদ্ধান্ত। অন্যথায় দেশ, জাতি ও সরকারকে শপিং মল, মার্কেট খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তের জন্য চরম মাশুল দিতে হবে। আল্লাহ না করুক; এমনো হতে পারে, বৈশ্বিক মহামারী ভয়ংকর করোনা পরিস্থিতি বাংলাদেশে এমন অনিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে চলে যাবে, যখন আর কারো কিছুই করার থাকবে না।

 

লেখক: সম্পাদক, নিউজচেম্বার টুয়েন্টিফোর ডটকম।