|
প্রকাশ: মঙ্গলবার, আপডেট : ২৮ এপ্রি ২০২০ ০৪:০৪ ঘণ্টা

জেদান আল মুসাঃ গনমাধ্যমকর্মী প্রেমী একজন মানবিক পুলিশ কর্মকর্তা

ফারহানা বেগম হেনা: মুজিববর্ষে বাংলাদেশ পুলিশের শ্লোগান হচ্ছে ‘মুজিববর্ষের অঙ্গীকার পুলিশ হবে জনতার। করোনাভাইরাসের কারনে সৃষ্ট বৈশ্বিক সংকটের আঁচ থেকে বাঁচতে পারেনি বাংলাদেশও। আর সারাদেশে চলমান লকডাউনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দিন রাত পরিশ্রম করে চলেছে বাংলাদেশ পুলিশ।

 

পথের মোড়ে কেউ নেই। কিন্তু পুলিশ আছে। সাধারণ নাগরিক জটলা পাকালে, সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার কাজেও আছে পুলিশ। কোনো এলাকায় করোনা রোগী শনাক্ত হলে মাইকিং করে ঘরে থাকার পরামর্শ দিচ্ছে পুলিশ। কার্যত লকডাউনের ভেতরে ঘরে খাবার নেই, কাউকে সে কথা বলতেও পারছেন না, খুব গোপনে ঘরে গিয়ে খাবার পৌঁছে দিচ্ছে পুলিশ।

 

শুধু কী তাই? সব সময় লাঠি হাতে থাকা পুলিশের সদস্যরা আজ যার পাশে কেউ নেই, তার পাশে দাঁড়াচ্ছেন। করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া রোগীর পাশে যখন কেউ আসছে না, তখন পুলিশ সদস্যরাই লাশ দাফন করছেন। করোনা আক্রান্ত এলাকা, বাড়ি কিংবা নির্দিষ্ট স্থান লকডাউনের পর করছেন তদারকিও। এখানেই শেষ নয়, করোনা প্রতিরোধে ত্রাণ বিতরণসহ নানা মানবিক কাজে জড়িয়ে পড়েছেন পুলিশ সদস্যরা।

 

যেন এ এক নতুন রূপ পুলিশের। করোনাভাইরাস নামক এই মহামারি একাই বদলে দিয়েছে পুলিশের এই রূপ! পুরো বাংলাদেশের মানুষ এখন এক নতুন মানবিক পুলিশ দেখছে। শুধু দেখছে না, তারা পুলিশের এই মানবিক আচরণকে সাধুবাদও জানাচ্ছে।

 

বিগত দিনের সকল বিতর্ক ছাপিয়ে মানবিকতার দৃষ্টান্ত চস্থাপন করছে সারাদেশে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী করোনাভাইরাসে এখন পর্যন্ত ৫৮ জন পুলিশ সদস্য আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২৭ জনই ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বিভিন্ন বিভাগে কর্মরত। এ ছাড়া সংক্রমণের ঝুঁকিতে আছেন, এমন ছয় শতাধিক পুলিশ সদস্যকে হোম ও প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে (সঙ্গনিরোধ) পাঠানো হয়েছে। এরপরও থেমে নেই পুলিশ। যার যার জায়গায় থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

 

তবে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ আর আন্তরিকতার অনন্য নিদর্শন দেখিয়ে অনেকের কাছে অণুকরণীয় হয়ে ওঠেছেন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মো. জেদান আল মুসা।

 

জেদান আল মুসা “করোনা ভাইরাস” পরিস্থিতিতে নিরলসভাবে কাজ করছেন। অসহায় মানুষদের মধ্যে কখন দিনে কখন রাতের আঁধারে অতি গোপনে মানুষকে বিভিন্ন ভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করে থাকেন। কখনও খাবার বিতরণ, কখনও নগদ অর্থের মাধ্যমে, কখনও বা মানসিক ভাবে সহায়তা করে থাকেন। তিনি মিডিয়াতে থেকেও প্রচার বিমুখ। করোনার এই সময়েও অফিস এবং অফিসে বাইরে সমান তালে কাজ করে যাচ্ছেন।

 

উনাকে জিজ্ঞেস করি ‌আপনি মিডিয়াতে কাজ করেন কিন্তু কখন আপনার ভালো কাজ গুলো প্রকাশ করেন না কেন? তখন তিনি বলেন সাহায্য সহযোগিতা করার ক্ষেত্রে গোপনীয়তা অবলম্বন করি। ত্রাণ বা সাহায্যের নামে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে প্রায়ই সময় ছবি প্রকাশ করা হচ্ছে। এতে করে একশ্রেণীর মানুষজন লজ্জাকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়ছে। তাদের আত্মীয় স্বজন,বন্ধুবান্ধব ও পাড়া প্রতিবেশীরা যখন এসব ত্রাণ গ্রহণের ছবি ও ভিডিও দেখছে তখন তারা লজ্জাকর পরিস্থিতির মধ্যে পতিত হচ্ছে। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তারাও এক সময় স্বাবলম্বী হবে, কিন্তু এসব ছবি বা ভিডিও তাদের ভবিষ্যতের জন্য লজ্জার বিষয় হবে। আমরা সবাই বাঙালি। সুখে দুঃখে সবাই একসাথে থাকবো। আমাদের দেশের সামাজিক বন্ধন অত্যন্ত সুদৃঢ়। সকলের সুখ-দুঃখ নিজেরা ভাগ করে নিই।

 

আরেকটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ আর আন্তরিকতার অনন্য নিদর্শন দেখিয়েছেন মো. জেদান আল মুসা করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে সিলেটের সবক’টি দৈনিক পত্রিকার প্রকাশনা সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। এতে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন পত্রিকা বিক্রি ও বিতরণকারী হকাররা। আর্থিক সংকটে পড়ে তারা অনেকেই দিশেহারা। এ দুঃসময়ে তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মো. জেদান আল মুসা।

 

ব্যক্তিগত উদ্যোগে নীরবে-নিভৃতে তিনি বিপাকে পাড়া পত্রিকা হকারদের বাসায় খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেয়া শুরু করেছেন। নিজের সাধ্যমতো এ কাজ অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন জেদান আল মুসা।

 

জানা গেছে, গত শনিবার রাতে হকারদের বাসায় বাসায় গিয়ে এসব খাদ্যসামগ্রী তুলে দেন মহানুভব এই পুলিশ কর্মকর্তা। খাদ্যসামগ্রীর মধ্যে ছিলো- চাল, ডাল, আলু, তেল, পেয়াজ, লবণ, চিনিসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য।

এ বিষয়ে জেদান আল মুসা বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে অঘোষিত লকডাউন চলছে দেশে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ও ওষুধের দোকান ছাড়া প্রায় সব বন্ধ। ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি বাবায় বাসায় পত্রিকা রাখতেন । বাবার দেখে দেখে পত্রিকা পড়ার অভ্যাস সে সময় থেকে। এখনও সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই পত্রিকায় চোখ না দিলে মনে হয় কী যেন একটা বাকি রয়ে গেল। দীর্ঘ অভ্যাসের প্রথম ব্যাঘাত ঘটল করোনা পরিস্থিতির কারণে। মূলত ব্যক্তিগত উদ্যোগেই হকারদের জন্য কিছু করার জন্য অনুভব করছিলাম বেশ কয়েকদিন থেকে। সমাজের এই নিম্নমধ্যবিত্ত চাকরিজীবী লোকেরা অনেক কষ্টে জীবনযাপন করছেন। তবে সামাজিক আত্মসম্মানের ভয়ে তারা সরকার বা স্থানীয়ভাবে কারও কাছে সাহায্য চাইতে পারছেন না।

 

যারা নিয়মিত পত্রিকা পড়ে অভ্যস্ত হকাররা তাদের কাছে অনেকটা আত্মীয়ের মতো মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘ঝড়, বৃষ্টি, রোদ সবকিছু উপেক্ষা করে এ মানুষগুলো কিন্তু ঘুম ভাঙার আগেই আমাদের বাসায় বাসায় পত্রিকা পৌঁছে দেন। একনিষ্ঠভাবে তারা এ কাজ করে যাচ্ছেন বছরের পর বছর ধরে। তাদের এই দু:সময়ে কী আমাদের পাশে দাঁড়ানো উচিত নয়?

 

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে বা চিকিৎসায় একেবারেই সম্মুখযুদ্ধে যারা কাজ করছেন তাদের একটি অংশ এই পুলিশ বাহিনী। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মানবিক অবস্থান যখন এই, তখন জরুরি প্রয়োজনে দেশ সেবার কাজে নিয়োজিত থেকে আক্রান্ত হচ্ছে অনেক পুলিশ সদস্য।

 

জেদান আল মুসা আরো বলেন, ‘করোনার মতো একটি মহামারির সময়ে আমরা দেশের জনগণকে বাঁচাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। মানুষকে সচেতন করা থেকে শুরু করে ত্রাণ পর্যন্ত আমরা ঘরে ঘরে পৌঁছে দিচ্ছি। এসব করতে গিয়ে সারা বাংলাদেশে অনেক পুলিশ সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। দেশকে বাঁচাতে আমরা শেষ পর্যন্ত লড়ে যাব। আর সিলেটের সম্মানিত নাগরিকদের আহ্বান জানাব, আপনারা ঘরে থাকুন, নিরাপদে থাকুন। নিজে বাঁচুন এবং দেশকে বাঁচান।

 

পুলিশ নিয়ে অনেকের বিরুপ ধারণা থাকলেও জেদান আল মুসা সিলেটে সে ধারণা সম্পূর্ণ বদলে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। সিলেটে তাঁর দায়িত্বগ্রহণের পর আধুনিকতা, প্রযুক্তি ও সততা দিয়ে অপরাধ দমন করার চেষ্টা করে চলেছেন। মেধাবী, পরিশ্রমী ও নিজের সততার মাধ্যমে পুলিশ বিভাগের ইমেজকেই দীপ্তমান করে চলেছেন প্রতিনিয়ত।

 

২০১১ সালে বিশ্বের মানচিত্রে দক্ষিণ সুদান স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। সেখানে শান্তি রক্ষার জন্য অন্যান্য দেশের পুলিশ বাহিনীর সাথে বাংলাদেশের যে কয়েকজন পুলিশ অফিসার বিদেশের মাঠিতে গিয়েছিলেন এবং সে সময় স্বদেশকে বহিঃবিশ্বে উপস্থাপন করেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম জেদান আল মুসা। জেদান আল মুসা ২০১১ সালে ও ২০১৭ সালে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দারফুর ও জুবাতে, দীর্ঘদিন অত্যন্ত দক্ষতার সহিত কাজ করেছেন।

 

মো. জেদান আল মুসা ২০১৩ সালের ১৮ এপ্রিল এসএমপিতে অতিরিক্ত উপ-কমিশনার হিসেবে যোগদান করেন। শুরুতে তিনি অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (অর্থ ও হিসাব) শাখায় দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি মহানগর গোয়েন্দা শাখার অতিরিক্ত উপকমিশনার এবং দীর্ঘ ৪ বছর ৬ মাস যাবৎ তিনি অতিরিক্ত উপকমিশনার দক্ষিণের দায়িত্ব পালন করেছেন।

 

২০০৬ সালে ২৫তম বিসিএসের মাধ্যমে সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশে যোগদান করেন। এর আগেও তিনি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দারফুরে ১ বছর ৪ মাস কর্মরত ছিলেন। এছাড়াও তিনি সাউথ সুদানে শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ করে এসেছেন।

এছাড়া তিনি সাতক্ষীরা জেলা পুলিশ, সিলেট ডিআইজি অফিসের স্টাফ অফিসার, কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী জেলা এবং চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। দেশ-বিদেশে বিভিন্ন প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া, জেদান আল মুসা খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজিতে বিএসসি (অনার্স) ও এমএস ডিগ্রি অর্জন করেন। কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর থানার গোয়াল গ্রামের বাসিন্দা জেদান ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত। তাঁর স্ত্রী ফারিহা বিনতে হক একজন গৃহিণী। জেদান আল মুসা ও ফারিহার লাবীবা ও জাহিত নামের এক ছেলে ও এক মেয়ে সন্তান রয়েছে।

 

জেদান আল মুসা জনবান্ধব পুলিশের এক অনন্য পথিকৃৎ। জনমনে প্রশংসিত এক কিংবদন্তি। জেদান আল মুসা বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছেন তার মানবিক মূল্যবোধ, প্রজ্ঞা ও সমাজ কল্যাণকর উদ্যোগের মাধ্যমে। তার উদ্যোগ মানব কল্যাণে অনন্য দৃষ্টান্ত রেখেছে।

সম্পাদক, ডেইলিবিডিনিউজডটনেট।