সর্বশেষ
|
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, আপডেট : ০৯ এপ্রি ২০২০ ০৪:০৪ ঘণ্টা

করোনাকাল : সিলেটে মধ্যবিত্ত ও প্রবাসীনির্ভর পরিবারের মাথায় হাত

ফারহানা বেগম হেনা :

সারা দুনিয়াকে স্তব্ধ করে দিয়েছে মরণঘাতক করোনা নামক ভাইরাস। বাংলাদেশেও হানা দিয়েছে এই ভাইরাস। ছাড়ছে না কাউকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার হার্ডলাইনে। এমন বাস্তবতায় ঘরবন্দী সর্বস্তরের মানুষ। সরকার ঘোষিত খাদ্য পৌছালেও দলীয় রীতিতে চলছে ত্রাণ বিতারণ কার্যক্রম। এই অবস্থায় বসে নেই সুযোগ সন্ধানীরাও। দলীয় পরিচয়ে তৎপর তারা। নিন্ম আয়ের মানুষ ছুটছে ত্রাণের খোঁজে। এমন পরিস্থিতিতে মধ্যবিত্ত অনেক পরিবারে চলছে চাঁপা কান্না। কর্মহীন হয়ে মধ্যবিত্ত অনেক পরিবারে নেই খাদ্যের যোগান। যা ছিল তাও শেষের পথে। মধ্যবিত্ত পরিবার সম্পর্কে সবার কম বেশি ধারনা আছে। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো কারো নিকট সাহায্য চাইতে পারেনা বা কাউকে সাহায্য করার ক্ষমতাও নেই তাদের। তারা নিজেদের উপার্জনে নিজেরা কষ্ট করেই জীবন যাপন করেন।

 

করোনা ভাইরাসজনিত কারনে হোম কোয়ারাইন্টিনে থাকায় তাদের কারো চাকরী নেই, কারো ব্যবসা বন্ধ অর্থাৎ তাদের আয়- উপার্জন বন্ধ। এরই মধ্যে বাসা ভাড়া, দোকান ভাড়া, মাস শেষে দোকান বাকীর চাপ, বাচ্চাদের স্কুল বেতন, মাস্টার বেতনসহ নানাবিধ খরচ বহন করতে হয়। মধ্যবিত্ত তার আত্মসম্মান নিয়ে ঘরে বন্দি, অন্য দিকে বাসার খাবার শেষ পর্যায়ে, বাজার করার মত টাকা হাতে নেই। নতুন করে যে মুদির দোকান থেকে বাকি নিয়ে আসবে তারও কোন উপায় নেই। মধ্যবিত্তরা আজ করোনার কারনে দিশেহারা। নীরব দুঃখকষ্ট ও দুশ্চিন্তার মধ্যে চলছে তাদের জীবন। এদিকে ঘনিয়ে আসছে রমজান মাস তার সাথে বাড়ছে বাড়তি খরচ। সব মিলিয়ে বর্তমানে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর অবস্থা আস্তে আস্তে কষ্টের দিনে পরিনত হচ্ছে।

 

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রুখতে সারাদেশে সবকিছু বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই মুহূর্তে গৃহবন্দি সাধারণ মানুষ। নি¤œ আয়ের মানুষের হাতে খাবার এবং প্রয়োজনীয় দ্রব্য তুলে দিচ্ছেন অনেকেই। সরকারও গরিব ও নি¤œ আয়ের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। তবে মধ্যবিত্তের পাশে নেই কেউ। ঘরে খাবার না থাকলেও মধ্যবিত্তরা লজ্জায় কিছু বলতে পারছে না। সারাদেশে লাখ লাখ মধ্যবিত্তের অবস্থাও প্রায় একই।

 

শিবগঞ্জ এলাকায় কথা হয় এক ব্যক্তির সঙ্গে। তিনি মধ্যবিত্ত পরিবারের লোক। আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘এটা কোনো জীবন হলো। সংসার চালাতে যুদ্ধ করতে হচ্ছে। চক্ষুলজ্জায় কষ্টগুলো প্রকাশ করা যায় না। ওই যে আমরা মধ্যবিত্ত। আমাদের কোনো কষ্ট নেই। আছে শুধু সুখ। কিন্তু এর আড়ালে আমরা যে কত কষ্টে জীবনযাপন করি, তা বোঝানো যায় না। কেউ বোঝারও চেষ্টা করে না।’

 

করোনাভাইরাসের আঘাতে সারাবিশ্বই স্থবির। এতে বেকার হয়ে পড়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা লাখ লাখ প্রবাসী। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বিদেশের মাটিতে মারা গেছেন অনেকে। এ ছাড়াও সৌদি আরব, কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে প্রায় দেড় লাখ অভিবাসী আটকা পড়েছেন। সবচেয়ে বেশি বিপদে আছেন যাদের বৈধ ভিসা নেই। এদের বড় অংশই কাজ ও আয়ের অভাবে না খেয়ে দিনাতিপাত করছেন। প্রবাসীরা হলো রেমিট্যান্স যোদ্ধা। দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখে আমাদের প্রবাসীরাই।

 

সিলেটসহ বাংলাদেশের অনেক জেলায় বহুসংখ্যক পরিবার আছে যারা একমাত্র বৈদেশিক আয়ের উপর নির্ভরশীল। প্রতি মাসে প্রবাস হতে টাকা আসে আর সেই টাকায় ঐ সব পরিবারের জীবন যাপন চলে। প্রবাসী নির্ভর পরিবারগুলো মোটামুটি দাপটে ও মান সম্মানে চলাফিরা করে। কিন্তু করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারনে আমাদের প্রবাসীরা আমাদের চেয়েও খারাপ অবস্থায় জীবন যাপন করতেছে।

 

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাস করছেন এ অঞ্চলের লাখো মানুষ। এদের অনেকেই পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। অনেক সংসারের চাকা ঘুরে প্রবাসের টাকায়। তাই পরিবারের উপার্জক্ষম ব্যক্তিকে নিয়ে চিন্তিত স্বজনরা। প্রবাসী নির্ভর পরিবাররা সাধারণত মধ্যবিত্ত বা উচ্চ মধ্যবিত্ত। ঐ পরিবারগুলো প্রায় সময় সমাজের কিছু কিছু উন্নয়নেও ভুমিকা রাখে। অথচ আজ হয়তো যারা বাসা ভাড়া থাকে তাদের বাসা ভাড়া নিয়ে চিন্তিত, তাদের পারিবারিক খরচ করতে হয়ত খুব হিমশিম খাচ্ছে।

 

ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যেপ্রাচ্যর বিভিন্ন দেশে শ্বাসরুদ্ধকর সময় পার করছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। দীর্ঘদিন আতঙ্কে কাটানোর পর এবার তাদের ঘরবন্দি হয়ে থাকতে হচ্ছে। এতে করে অনেকেই উদ্বেগ-উৎকন্ঠার মধ্যে আছেন। কারণ করোনায় আক্রান্ত হলে তাদের মরদেহ পরিবারের কাছে পৌঁছাবে না। শুধুমাত্র একটা ডেথ সার্টিফিকেটে ভরসা করতে হবে।

 

একদিকে প্রবাসীরা বিভিন্ন দেশে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় আছেন, অন্যদিকে তাদের স্বজনরা দেশে থেকেও শান্তিতে নাই। প্রিয় মানুষগুলোর জন্য তাদের প্রতিটা মূহুর্ত কাটছে নানা চিন্তায়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ইচ্ছে করলেই প্রবাসীরা দেশের স্বজনদের কাছে আসতে পারবেন না। এমনকি আক্রান্ত হলে তাদের সেবা করার সুযোগ থাকছে না।

মহামারি করোনা ভাইরাস আমাদের প্রবাসী নির্ভর পরিবার গুলোর অবস্থা খারাপ করে ফেলেছে। এই কঠিন পরিস্থিতিতে মধ্যবিত্ত ও প্রবাসী নির্ভরশীল পরিবারগুলো খুবই কষ্টে জীবন যাপন করতেছে। প্রবাসীরা দেশে টাকা পাঠাতে না পারলে দেশের রিজার্ভে বিরূপ প্রভাব পড়বে। এ ছাড়াও অনেক ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। এ কারণে পরিস্থিতি মোকাবেলায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোসহ বিকল্প কর্মসূচি নিয়ে ভাবতে হবে।

 

অন্যদিকে প্রবাসীদের এই দুরবস্থা রেমিটেন্সেও প্রভাব পড়ছে। গত দুই মাসে ৩৬ কোটি ডলার রেমিটেন্স কমেছে। যা স্থানীয় মুদ্রায় তিন হাজার কোটি টাকা। এ অবস্থায় প্রবাসীদের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসের মাধ্যমে সহায়তার কথা বলছেন, অর্থনীতিবিদ ও এ খাতের সংশ্লিষ্টরা।

লেখক: সাংবাদিক ও সংগঠক।