সর্বশেষ
|
প্রকাশ: বুধবার, আপডেট : ০১ এপ্রি ২০২০ ১২:০৪ ঘণ্টা

মুসলিম ইতিহাসের এক ট্রাজেডি : এপ্রিল ফুল||রেজাউল করিম (মছরুর)

রেজাউল করিম (মছরুর):

পহেলা এপ্রিল!

পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ, বাংলাদেশের স্কুল, কলেজ, অফিস আদালত সর্বত্রই পালিত হবে ” এপ্রিল ফুল”! একে অপরকে (Fool) তথা বোকা বানাবার কৌশল করবে! কিন্তু কী সেই এপ্রিল ফুল, তা অনেকেরই জানা নেই! জানার আগ্রহ ও অনেকে হারিয়ে ফেলেছে অথচ ” এপ্রিল ফুল” হচ্ছে আত্ন প্রবঞ্চিত মুসলিম ইতিহাসের এক বেদনাদায়ক অধ্যায়!

আসুন, এর (BACK GROUND) বা পটভুমি জানার চেষ্টা করি!

তখন ১৪৯২ খ্রিষ্টাব্দ! স্পেনে মুসলিম শাসন চলছে! পর্তুগীজ রাণী ইসাবেলা এবং পাশ্ববর্তী রাজ্যের রাজা ফার্ডিনান্ড এক বিশাল খৃষ্টান বাহিনী সাথে নিয়ে মুসলিম স্পেনের উপর অতর্কিতভাবে প্রচন্ড আক্রমণ চালালো! অপ্রস্তুত মুসলিম সেনাবাহিনী খৃষ্টানদের এ অপ্রত্যাশিত আক্রমন প্রতিরোধ করতে না পেরে রাজধানী গ্রাণাডায় আশ্রয় নেয়! কিন্তু নিষ্ঠুর শাষক ফার্ডিনান্ড শুধু স্পেন বিজয় করে ক্ষান্ত হয়নি বরং স্পেনকে সম্পুর্ণ মুসলিম মুক্ত করার লক্ষে ঘোষনা করে, ” যে সমস্ত মুসলমান নিরস্ত্র হয়ে গ্রানাডার মসজিদ গুলোতে আশ্রয় নেবে তাদেরকে পুর্ণ নিরাপত্তা দেয়া হবে”!

মুসলমানরা দ্রুত ফার্ডিনান্ডের কথায় বিশ্বাস করে মসজিদগুলোতে আশ্রয় নেয়! এতক্ষনে বিশ্বাস ঘাতকের আসল চেহারা প্রকাশ পেল! সে অঙ্গীকার ভঙ্গ করে তিনদিন পর্যন্ত মুসলমানদেরকে

মসজিদে বন্দি রাখল, অবশেষে প্রতারক ফর্ডিনান্ড মসজিদগুলোর চারদিকে আগুন লাগিয়ে দিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করল লক্ষ লক্ষ মুসলমান! সেই দিনটি ছিল পহেলা এপ্রিল! এভাবে মুসলমানদেরকে হত্যা করে ফর্ডিনান্ড দানবের মতো হেসে হেসে বলল “হায় মুসলমান! তোমরা হলে APRIL FOOL অর্থাৎ এপ্রিলের বোকা!”

চিন্তা করে দেখুন আমরা মুসলমানরা এপ্রিল ফুলের নামে কোন দিবস পালন করছি! বিবেককে প্রশ্ন করলে নিজেদের অপরাধবোধ ধরা পড়তে দেরি হবেনা! আমরা আত্নবিস্মৃত মুসলমান! আমরা আমাদের ইতিহাস জানতে দেরি করি¡!

এককালের মুসলিম স্পেনঃ

এ হত্যাযজ্ঞের ৮০০ বছর পুর্বের ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই স্পেনের খৃষ্ঠান শাসক রডারিকের

অত্যাচারে মানবতা চিৎকার দিয়ে আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করছিল!

আল-কোরআনের ভাষায় ” হে আমাদের রব, আমাদেরকে এ যালেমদের কবল থেকে বের করে নাও, এবং আমাদের জন্য আপনার পক্ষ থেকে একজন অভিভাবক ও সাহায্যকারী নিযুক্ত করে দাও” ! (সুরা আন নিসা, আয়াত-৭৫)

মানবতার আর্তনাদের জবাবে আল্লাহ তাদের জন্য একজন সাহায্যকারী পাঠালেন! উমাইয়া খলীফা প্রথম ওয়ালিদের শাসনামলে সেনাপতি তারিক বিন যিয়াদ মাত্র ১২হাজার সৈন্য নিয়ে রডারিকের এক লক্ষ সেনাবাহিনীর মোকাবেলায় স্পেন রওয়ানা হন!

৭১১ সালের এক শুভক্ষণে ভুমধ্যসাগরের উত্তাল তরঙ্গমালা পাড়ি দিয়ে সৈন্যসহ সাগর তীরে নামলেন তারিক যালিমের ক্ববল থেকে মজলুম, পথহারা স্পেনবাসীকে মুক্ত করে ইসলামের ছায়াতলে সমবেত করার তামান্নায় উদ্বেলিত হয়ে তারিক মুসলিম সৈন্যদের নির্দেশ দিলেন নিজেদের জাহাজগুলো জ্বালিয়ে দিতে! সকল জাহাজ জ্বালিয়ে দেওয়া হলো!

সেনাপতি তারিক দীপ্তকন্ঠে ঘোষনা করলেন, ” বীর মুজাহিদ ভাইসব, তোমরা জান, যে জাহাজে আমরা ভুমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে এসেছি তা ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে! তোমাদের সামনে খৃষ্টানদের বিশাল বাহিনী আর পেছেনে উত্তাল সমুদ্র!

বুঝতেই পারছ!

তোমাদের জন্য দু’টি বাস্তবতা অপেক্ষা করছে! তার একটা হলো রডারিকের সৈন্যদের বিরুদ্ধে প্রাণপণ জিহাদ করে শাহাদাত হাসিল করা, আর দ্বিতীয়টা হচ্ছে কাপুরুষের মতো পিছনে পালিয়ে দিয়ে সাগর বক্ষে ঝাপ দেয়া, এখন আমি তোমাদের কাছে জানতে চাই তোমরা কোনটি বেছে নেবে”?

মুজাহিদগন সমস্বরে বলে উঠলেন ” আমরা কাপুরুষ নই, জিহাদ করে শাহাদাত বরণ করতে আমরা প্রস্তুত!” সঙ্গী মুজাহিদগনের জবাব শুনে সেনাপতি এক হৃদয় বিদারক ভাষন দেন! ভাষনের পর মুসলিম বাহিনী ‘আল্লাহু আকবার্ִ’ ধ্বনিতে সম্মুখ পানে এগিয়ে চলেন!

মুসলিম বাহিনীর ঈমানী শক্তির কাছে ক্ষনিকের মধ্যেই খৃষ্ঠান রডারিক বাহিনী পরাজিত হলো, তারপর শুরু হলো মুসলিম শসনের গৌরবময় সোনালী যাত্রা! ধীরে ধীরে স্পেনের খৃষ্টানরা ইসলাম গ্রহন করতে থাকে!এবং স্পেন হয়ে ওঠে সারা বিশ্বের মুসলিম জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কেন্দ্রবিন্দু!

মুসলমানদের ৮০০ বছরের শাসনের ফলে স্পেন যখন একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হলো, তখন স্পেনের শাসকরা ক্রমশ ইসলামের সঠিক আদর্শ ভুলে গিয়ে অনুসরণ করতে লাগলো বিজাতীয় আদর্শকে! তখনই ঘটলো পহেলা এপ্রিলের এই ঐতিহাস্যিক ট্রাজেডি!

বর্তমানেঃ

যেমন মুসলিম সমাজ কু-সংস্কারে আচ্ছন্ন হচ্ছে, ইংরেজী নববর্ষের প্রথম দিনে “থার্টি ফাস্ট নাইট” নামে বেহায়াপনা, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস নামে বেহায়া, নোংরামি, মৃত ব্যাক্তির সামনে দাড়িয়ে নিরবতা পালন সহ নানা ধরণের কু-প্রথা খৃষ্টান, ইহুদি ও হিন্দুদের কালচার থেকে মুসলিম সমাজে আমদানি করা হচ্ছে!

অত্যান্ত পরিতাপের বিষয় মুসলমানদের একটি রুচিশিল, উন্নত , স্বাতন্ত্র‍্যমন্ডিত ও সুস্থ সংস্কৃতি থাকা

সত্ত্বেও কৌশলে বিজাতীয় আচার-আচরণ  মুসলিম সমাজে অনুপ্রবেশ করেছে! মডেলিং, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, পতিতাবৃত্তি, সুন্দরী প্রতিযোগিতা, সহশিক্ষা ইত্যাদি

মুসলিম সমাজে ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে!

.

বিশেষতঃ যে এপ্রিল মাসে খৃষ্টান শক্তি বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে স্পেন তথা ইউরোপ থেকে মুসলমান নির্মুল করেছিল, সেই পহেলা এপ্রিল শোক পালন তো দুরের কথা, মুসলমানদের মাঝে তা আনন্দের অনুষ্ঠান হিসেবে চালু হয়েছে! মুসলিম শাসকদের বিলাসপ্রিয় হওয়ার এবং এহেন আধঃপতনের মুল কারণ একটাই! তাহলো কোরআন-হাদিস তথা ইসলামী শিক্ষাকে ভুলে গিয়ে মুসলমানরা নিজেদের জিহাদি চেতনাকে সম্পুর্ণ হারিয়ে ফেলেছে!

তাইতো আজ দেখতে পাই, গোটা আরব বিশ্ব শক্তি ও সম্পদে ভরপুর হওয়া সত্ত্বেও তথাকথিত বিশ্ব মোড়ল মার্কিনীদের মদদপুষ্ট ছোট্র ও অবৈধ ইসরাইল রাষ্ট্রের কাছে জিম্মী হয়ে আছে! আর মুসলমানদের পবিত্রভুমি ফিলিস্তিনকে রক্ষাকল্পে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে গড়িমসি করছে ঈমানী শক্তির অভাবে! অবশেষে কুসংস্কারাচ্ছন্ন মুসলিম সমাজের পরিত্রানের উপায় হিসাবে আল্লামা ইকবালের বাণীটি স্মরণ করে দিচ্ছি-

” সবক্ব ফের পড় সাদাক্বাতকা

সুজাওয়াতকা, আদালাতকা

লিয়ে জায়েগা তুজছে ক্বামে ইমামতকা”

অর্থাৎ : “শক্ত করে ধর আবার ত্যাগ, সাহস আর নৈতিকতার পথ, তাহলে পেয়ে যাবে ধরার ইমামত!”

 

লেখকঃ

কর্মকর্তা,

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড

গাছবাড়ী বাজার আউটলেট।