সর্বশেষ
|
প্রকাশ: শনিবার, আপডেট : ১৪ মার্চ ২০২০ ০৩:০৩ ঘণ্টা

একজন বাশারের চলে যাওয়া……

চেম্বার ডেস্ক: 

এম এ বাশার খান, মোহনা টেলিভিশনের কুমিল্লা জেলা প্রতিনিধি। ২০১০ সালের ১১ নভেম্বর সম্প্রচারের শুরু থেকেই জেলার দায়িত্বে ছিলেন। স্বপ্নও ছিল, আমৃত্যু মোহনার সাথে থাকার। প্রায়শই আমাকে বলতেন, আপনি যতদিন মোহনায় আছেন, ততদিন আমিও আছি। ভাগ্যের কি পরিহাস, আমি এখনও আছি। কিন্তু তিনি নেই।– নেই বলতে কেবল মোহনায় না, দুনিয়াতেই নেই প্রিয় ভাইটি আমার।

গেল  ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, চলে যান না ফেরার দেশে। মোহনায় যোগ দেয়ার পর থেকে সহকর্মী হিসেবেই নয়-বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে অভিভাবকের মতোই ছায়া হয়ে থাকতেন। অনেক কারণেই কখনোই মনে হয়নি যে, আমি তার বস। আমার স্বভাবটাই এমন, সব প্রতিনিধিকে সহকর্মীর পাশাপাশি পরিবারের সদস্য মনে করি। অবশ্য তারাও আমাকে যথেষ্ট সম্মান ও শ্রদ্ধা করেন। সম্পর্কটা এমনই যে, অনেকে পারিবারিক সমস্যাও শেয়ার করেন।

অন্য সহকর্মীদের মতো বলছিলাম বাশার ভাইয়ের কথা। এমন কোনদিন নেই যেদিন দু’জনের মধ্যে কথা হয়নি। উনার পরিবারের এমন কোন সদস্যও নেই যিনি আমাকে চেনেন না। সব বিষয়েই জানাতেন আমাকে। অন্যসব প্রতিনিধির সাথেও বাশার ভাইয়ের সর্ম্পক ছিল মধুর। নিজ এলাকার সমস্যা-সম্ভাবনার সংবাদ নিয়ে এতোই ভাবতেন-যা বোঝানো কঠিন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কার্যক্রম নিয়ে সংবাদ পরিবেশন নিয়েও থাকতেন সচেতন। বলতেন, সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরা সবার দায়িত্ব।

কুমিল্লায় তার সাথে আরো একজন কর্মরত আছেন। তাওহীদ হোসেন মিঠু একসাথে অনেকদিন কাজ করছেন, তবে দুজনের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হয়নি কোনদিন। সবশেষ মৃত্যুর দিন বিকেলেও আমাকে ফোন করে বলেছিলেন চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে ২/১ দিনের মধ্যে ঢাকায় আসবেন। বললাম, অফিসে দেখা হবে। ঢাকায় এলেন ঠিকই, দেখাও হলো-কিন্তু অফিসে নয়, লাশবাহী গাড়িতে। মৃত্যুর পরপরই উনার বড় ছেলে সায়মন ফোন করে জানালো, বাবা নেই। ও প্রান্তে কি যে শোক তা বুঝে উঠার আগেই আমি হতভম্ভ হয়ে পড়লাম। একাধিকবার জিজ্ঞেস করলাম সায়মন কি বলছ, বারবারই একই উত্তর। সঙ্গে সঙ্গেই কর্মস্থল মোহনা টেলিভিশনের স্ক্রলে বাশারের মৃত্যুর সংবাদ সর্বশেষ দিলাম, অথচ এমন সংবাদ দিতে প্রায়ই তিনি অনুরোধ করতেন। হয়তো ভাবেননি নিজের মৃত্যুর সংবাদ প্রচার হবে তার প্রিয় মোহনায়। রাত ১২টার সংবাদে তড়িঘড়ি করে সংবাদ ধরিয়ে দিলাম। ততক্ষণে সহকর্মী হুমায়ুন কবীরকে ফোন করে অনুরোধ করলাম বাসা থেকে বের হতে। মুহূর্তের মধ্যে তিনি চলে এলেন অফিসের নিচে। দুজনে চলে গেলাম হাসপাতালে। নিথর দেহটা দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না। পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দিয়ে লাশবাহী গাড়ি লাকসামের উদ্দেশে ছেড়ে গেল, আর আমি ফিরলাম বাসায়।

এর আগে অবশ্য fb-তে বাশার ভাইয়ের মৃত্যুর খবর জানিয়ে দিই সহকর্মীদের। অনেককে ফোনও করি। বাশার ভাইয়ের সাথে সবশেষ দেখা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে কুমিল্লার একটি হোটেলে। মাত্র ১০ মিনিট বাসযাত্রা বিরতির সময়। তিনি ছাড়াও মিঠু এবং কুমিল্লার কয়েকজন সংবাদকর্মী মিলে চা খেলাম। সেদিন কেন যেন সবাই একসঙ্গে ছবিও তুললাম। অবশ্য তিন মাস আগে মোহনা টিভির বিভাগীয় প্রতিনিধি সম্মেলনে চট্টগ্রাম ব্যুরো অফিসে পুরো একদিন ছিলাম। স্মৃতিগুলো কোনভাবেই ভুলতে পারছি না। মনে হলো সবার সাথে শেয়ার করলে হয়তো ভারটা একটু কমবে। একজন ভাল মানুষ, বন্ধু, সহকর্মীকে হারিয়ে নির্বাক আমি। বাশার খানের আত্মার শান্তি কামনা করি। সৃষ্টিকর্তা যেন তাকে বেহশত নসিব করেন, আমিন।

লেখক- শহীদুল আলম ইমরান, যুগ্ম বার্তা সম্পাদক ও ন্যাশনাল ডেস্ক ইনচার্জ, মোহনা টেলিভিশন।