সর্বশেষ
|
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, আপডেট : ২০ ফেব্রু ২০২০ ০৩:০২ ঘণ্টা

একুশের গৌরবময় ইতিহাস সব প্রজন্মকে জানতে হবে : প্রধানমন্ত্রী

চেম্বার ডেস্ক: ভাষা আন্দোলনকারীদের রক্তের ঋণের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তাদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার। একুশের গৌরবের ইতিহাস সব প্রজন্মকে জানতে হবে। এখন বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে অন্য ভাষা শেখার প্রয়োজনীয়তা আছে, তাই বলে নিজের ভাষাকে ভুলে যাওয়া ঠিক নয়।

আজ বৃহস্পতিবার (২০ ফেব্রুয়ারি) বেলা ১১টার পর রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ‘একুশে পদক ২০২০’ প্রদান অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

ধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৪৮ সাল থেকেই জাতির পিতা ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠনেও তিনি ভূমিকা রেখেছেন। তবে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, একসময় তার নাম ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাস ইতিহাসই, তা কেউ মুছে ফেলতে পারে না। বাস্তবতা হলো, ১৯৪৮ সালে বঙ্গবন্ধু যখন ভাষা আন্দোলন শুরু করেন, তখন থেকেই পাকিস্তানি বাহিনী তার ওপর নজরদারি ও তার বিরুদ্ধে প্রতিবেদন লিখতে শুরু করে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনের প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, আইবি (গোয়েন্দা) রিপোর্টে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে বলা হয়, ১৯৫২ সালে জেলে থেকেও তিনি ছাত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। জেলে গিয়ে ছাত্ররা তার সঙ্গে দেখা করতেন। তারা দেখা করতে গিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে গিয়ে কী কথা বলতেন, তা শোনার জন্য বাইরে থেকে অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু কিছু শুনতে পাইনি। দায়িত্বরত পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, ছাত্ররা যেন জেলে এসে বৈঠক করতে না পারে, কিন্তু পুলিশ তা শোনেনি।

তিনি বলেন, পৃথিবীর কোনো দেশেই কোনো নেতার বিরুদ্ধে লেখা গোয়েন্দা প্রতিবেদন কেউ প্রকাশ করেনি। আমি এটা করেছি। কারণ, ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, সব কিছু থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলার একটা চেষ্টা করা হয়েছে দীর্ঘ ২১ বছর। তাই আমি চেয়েছি, সত্যটা মানুষের জানা উচিত। এই গোয়েন্দা প্রতিবেদনের এর চার খণ্ড বই আকারে প্রকাশ হয়েছে। পঞ্চম খণ্ড প্রকাশ হচ্ছে। মোট ১৪ খণ্ড প্রকাশ করা হবে। বাংলাদেশের যে ইতিহাস, তার বিরাট অংশ এ গোয়েন্দা প্রতিবেদনে পাওয়া যায়।

সরকারপ্রধান হিসেবে তিনি জাতিসংঘের অধিবেশনে বারবার বাংলায় ভাষণ দিয়ে যাচ্ছেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার পর জাতির পিতা জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়েছিলেন। তারই পদাঙ্ক অনুসরণ করে সরকারপ্রধান হিসেবে বারবার বাংলায় ভাষণ দিয়ে যাচ্ছি।

তিনি বলেন, আমাদের স্বাধীনতা, আমাদের ভাষার অধিকার, আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের কৃষ্টি, এটাকে সমৃদ্ধ করা, চর্চা করা, এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটা সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি করা আমাদেরই কর্তব্য। আমরা অনেক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যে অর্জন করেছি, তার সুফলটা যেন আমাদের আগামী প্রজন্ম ভোগ করতে পারে, তারা যেন একটা সুন্দর জীবন পায়, সেটাই আমরা চাই।

২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি পেতে কানাডাপ্রবাসী আবদুস সালাম ও রফিকুল ইসলাম নামের যে দুজন ব্যক্তি দীর্ঘদিন প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী তাদের উদ্দেশে বলেন, ১৯৫২ সালের দুজন ভাষা শহীদের নামে আপনাদের নাম। আপনাদের মাধ্যমেই হয়তো ভাষা শহীদ ও দিবসের স্বীকৃতির উদ্যোগ নেওয়ার কথা ছিল।

নিজেদের পরিচয় নিয়ে গর্বের সঙ্গে চলার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, গত এক দশকে বাংলাদেশ যেভাবে এগিয়েছে, এ অগ্রযাত্রা যেনো অপ্রতিরোধ্যভাবে অব্যাহত থাকে আমরা সেটাই চাই। সেই সঙ্গে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চা ও আন্তর্জাতিকভাবে বিস্তৃতি লাভের ব্যাপারেও সক্রিয় থাকতে হবে। আমরা বাঙালি, বাঙালি হিসেবেই বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে চলব।

পদকপ্রাপ্তদের অভিনন্দন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে যারা একুশে পদক পেয়েছেন তারা আমাদের গুণীজন। তারা স্ব-স্ব ক্ষেত্রে কীর্তিমান। দেশ-জাতি-ভাষায় তাদের বিশাল অবদান রয়েছে। সেই অবদানের কথা সবসময় আমরা স্মরণ করি। একুশে ফেব্রুয়ারির প্রাক্কালে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি এই সংগ্রামে যারা অংশগ্রহণ করেছেন, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। আজ যেসব গুণীজন পুরস্কৃত হয়েছেন, তাদের প্রতিও আন্তরিক অভিনন্দন।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল এবং সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসালাম।

এর আগে অমর একুশে ফেব্রুয়ারি এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে ২০ ব্যক্তি এবং একটি প্রতিষ্ঠানকে ‘একুশে পদক-২০২০’ প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

একুশে পদক ২০২০ প্রাপ্তরা হলেন- ভাষা আন্দোলনে প্রয়াত আমিনুল ইসলাম বাদশা (মরণোত্তর), শিল্পকলায় (সংগীত) বেগম ডালিয়া নওশিন, শঙ্কর রায় ও মিতা হক, শিল্পকলায় (নৃত্য) মো. গোলাম মোস্তফা খান, শিল্পকলায় (অভিনয়) এম এম মহসীন, শিল্পকলায় (চারুকলা) অধ্যাপক শিল্পী ড. ফরিদা জামান, মুক্তিযুদ্ধে প্রয়াত হাজি আক্তার সরদার (মরণোত্তর), প্রয়াত আব্দুল জব্বার (মরণোত্তর), প্রয়াত ডা. আ আ ম মেসবাহুল হক (বাচ্চু ডাক্তার) (মরণোত্তর), সাংবাদিকতায় জাফর ওয়াজেদ (আলী ওয়াজেদ জাফর), গবেষণায় ড. জাহাঙ্গীর আলম, হাফেজ কারী আল্লামা সৈয়দ মোহাম্মদ ছাইফুর রহমান নিজামী শাহ, শিক্ষায় অধ্যাপক ড. বিকিরণ প্রসাদ বড়ুয়া, অর্থনীতিতে অধ্যাপক ড. শামসুল আলম, সমাজসেবায় সুফি মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, ভাষা ও সাহিত্যে ড. নুরুন নবী, প্রয়াত সিকদার আমিনুল হক (মরণোত্তর) ও বেগম নাজমুন নেসা পিয়ারি এবং চিকিৎসায় অধ্যাপক ডা. সায়েবা আখতার। পাশাপাশি ‘গবেষণা’য় একুশে পদকের জন্য মনোনীত হয়েছে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট।