সর্বশেষ
|
প্রকাশ: মঙ্গলবার, আপডেট : ১১ ফেব্রু ২০২০ ০৮:০২ ঘণ্টা

কেন কানাইঘাট উপজেলা ভাঙবেন না :সরওয়ার ফারুকী

সরওয়ার ফারুকী :

‘কানাইঘাট’ শব্দের বয়স বড়জোর দেড়শো বছর। ১৮৮০ সালের আগ পর্যন্ত কানাইঘাট শব্দের অস্তিত্ব ছিল না। মাত্র দেড়শো বছর বয়সের এই শব্দ কয়েক হাজার বছরের ঐতিহাসিক চিহ্ন ধারণ করে বেড়ে ওঠেছে।

জৈমিনি মহাভারতের বিবরণ অনুযায়ী প্রায় পাঁচহাজার বছরেরও অধিক বয়সী কানাইঘাটের ভূখণ্ড! কেচ্ছা-কাহিনী যা-ই থাকুক না কেন— এ ভূমি যে পুরো বঙ্গ অঞ্চলের চেয়েও পুরনো— তা জ্ঞানী মাত্রই অবগত। প্রাচীনত্বের অহঙবোধে এ জমিন অনেক নামীদামীদেরও টেক্কা দিয়ে চলে!

শেষ একহাজার বছরের জ্যান্ত ইতিহাস ঘাটলেও দেখা যায়— এ অঞ্চলের মেজাজ-মর্জি খানিকটা আলাদা। বিশ্বখ্যাত কিংবদন্তী হজরত শাহজালাল (র.)-র বাহিনিও এখানে আসেন নি, অথবা আসতে চাননি। এভাবেই একটু আলাদা চলতে চেয়েছে বৃহত্তর জৈন্তা। ব্রিটিশদের অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায়ও সমগ্র উপমহাদেশের মধ্যে জৈন্তা রাজ্যই সর্বাধিক সময় স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রেখেছিল। ব্রিটিশ শাসনামলে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের প্রয়োজনেই প্রথম ‘কানাইঘাট’ শব্দ ও স্থানের উৎপত্তি। ১৮৮০ সালে জৈন্তাকে প্রশাসনিক প্রয়োজনে বিকেন্দ্রীকরণ করলেও ব্রিটিশরা ভাগবাটোয়ারা করেনি। একইভাবে পাক আমল হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ আমলেও কানাইঘাটের আলাদা পরিচয়ে আঘাত আসে নি।

কানাইঘাটের ইতিহাস-ঐতিহ্য, কানাইঘাটবাসীর চলাফেরা, মনমানসিকতার সাথে দেশের অপরাপর অঞ্চলের আছে কিঞ্চিৎ পার্থক্য। এ পার্থক্যই কানাইঘাটবাসীর সৌন্দর্য। শেষ দেড়শো বছরের শিক্ষা-আন্দোলন, তাহযিব তামাদ্দুনের অন্যরকম চর্চা, কানাইঘাটের অসংখ্য উলামায়ে কেরামের আত্মত্যাগ এই জনপদের মনোজগত গঠনে অসামান্য অবদান রেখেছে। অন্যরকম এক ছন্দ ধারণ করেই কানাইঘাটবাসী পরস্পরকে ভালোবেসে একই উপজেলার বাসিন্দা হিসেবে থাকতে চেয়েছে, থাকছে।

উন্নয়নের অবারিত দুয়ারে প্রবেশ ও শান্তি-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ব্রিটিশ প্রশাসন ১৮৪১ সালে মুলাগুল পরগণার লক্ষীপুর মৌজায় ঝরনাঝরা টিলায় থানা স্থাপন করেন। মূলত ‘মুলাগুল স্টেশন’ স্থাপনের মধ্য দিয়েই কানাইঘাটের ভৌগলিক স্বাতন্ত্রের প্রথম ধাপ রচিত হয়। ১৮৮৫সালের দিকে মুলাগুল স্টেশন কানাইঘাটে স্থানান্তরিত হয় এবং কানাইঘাট স্টেশন নামধারণ করে।

১৯৫৯ সালে মৌলিক গণতন্ত্র পদ্ধতি প্রবর্তন-পরবর্তী সময় কানাইঘাটের ৯টি পরগনা সাতটি ইউনিয়নে রূপান্তরিত হয়ঃ- ১নং লক্ষীপ্রসাদ ইউনিয়ন/২নং দিঘীরপার ইউনিয়ন/ ৩নং বড়চতুল ইউনিয়ন/ ৪ নং কানাইঘাট (সদর) ইউনিয়ন/ ৫নং দক্ষিণ বানীগ্রাম ইউনিয়ন/ ৬নং ঝিঙাবাড়ী ইউনিয়ন/ ৭নং রাজাগঞ্জ ইউনিয়ন। বাংলাদেশ সরকার ১নং লক্ষীপ্রসাদ ও ২নং দিঘীরপাড় ইউনিয়নদ্বয় ভেঙে আরও দুটি ইউনিয়নের বৃদ্ধি করলে কানাইঘাট ৯টি ইউনিয়নে উন্নীত হয়। ১৯৮৩সালে সরকারি সিদ্ধান্তে কানাইঘাট থানা উপজেলায় রূপান্তরিত হয় এবং ২০০৫ সালে উপজেলা সদরের বিভিন্ন ওয়ার্ডের সমন্বয়ে থানা সদরকে পৌরসভায় উন্নীত করা করা হয়।

প্রায় দুই যুগ ধরে ৭, ৮ ও ৯নং ইউনিয়নবাসী নানাবিধ যৌক্তিক কারণে একটি নতুন প্রশাসনিক থানা গঠনের দাবী জানিয়ে আসছেন। গঠনশৈলীর দিক থেকে কানাইঘাট উপজেলা লম্বাটে, উপজেলা সদর থেকে প্রান্তীয় জনতার দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার! প্রশাসনিক প্রয়োজনে, নিরাপত্তার প্রশ্নে এ দূরত্ব সরকারের দিক থেকেই অধিক সমস্যাসঙ্কুল। একটি অঞ্চল তার কেন্দ্র থেকে যত দূর যায়, নিয়ন্ত্রণ-শক্তিও ততো দূর্বল হয়। তাই, এলাকার সচেতনসমাজ এ অসুবিধা দূরীকরণের স্বার্থে প্রশাসনের অংশীদারত্ব চাচ্ছেন। ইতোমধ্যে গাছবাড়ি এলাকাবাসী দাবীর যৌক্তিকতা প্রমাণের লক্ষ্যে একটি সুদীর্ঘ তালিকা পেশ করেছেন। তারা বলছেনঃ এখানে রয়েছে উপমহাদেশের প্রাচীনতম শিক্ষা প্রতিষ্টান গাছবাড়ী জামিউল উলুম কামিল মাদরাসা, গাছবাড়ী আইডিয়্যাল ( ডিগ্রী) কলেজ, গাছবাড়ী মডার্ণ একাডেমী, গাছবাড়ী মহিলা দাখিল মাদরাসা-সহ অনেকগুলো প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্টান। এছাড়াও রয়েছে অগ্রণী ব্যাংক, পুবালী ব্যাংক, বিভিন্ন ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিংসহ নানান বীমা কোম্পানী।

মাননীয় জেলা প্রশাসক বরাবরে যে তিনটি ইউনিয়ন নিয়ে থানা গঠনের প্রস্তাাব হয়েছে— সেখানে রয়েছে অনেকগুলো উন্নত শিক্ষা প্রতিষ্টান ও বাজার। বিশেষ করে ঝিংগাবাড়ী ফাজিল মাদরাসার পরিচিতি উপমহাদেশ জুড়েই। ঝিংগাবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, মানিকগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়, বড়দেশ উচ্চ বিদ্যালয়, বশির আহমদ উচ্চ বিদ্যালয়, সুরমা উচ্চ বিদ্যালয়, বীরদল উচ্চ বিদ্যালয়, শিকদার ফাউন্ডেশন কলেজ, তালবাড়ী জামেয়া ইসলামীয়া ফাজিল মাদরাসাসহ জনসংশ্লিষ্ট নানা প্রতিষ্ঠান।

জনগণ চেয়েছে আইনি সহযোগিতা তার দুয়ারে দ্রুত পৌঁছানোর জন্য নতুন একটি প্রশাসনিক থানাÑ যা অসৎ লোকদের দৌরাত্ম ঠেকাতে ভূমিকা রাখবে। কিন্তু প্রশাসন করতে গেলেন জনগণের ভ্রাতৃত্ম, ঐতিহ্য, ঐক্য, আত্মীয়তায় ফাটল ধরাতে!

নগরায়নের এই যুগে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের জরুরি প্রয়োজন। সে প্রয়োজনের নিমিত্তেই দীর্ঘদিন ধরে ওমন একটা জনদাবিও ছিল। অথচ ঢাকায় বসে, কলমের ডগায় জনগণের দাবী নয় ওমন একটা কাল্পনিক ম্যাপ তারা এঁকে দিতে চাইছেন! অপরিপক্ক, ইতিহাস-ঐতিহ্যবিমুখ অনেকের মন-মর্জির দৌরাত্ম্যে কি কয়েক হাজার বছরের ধারাবাহিকতা ভেঙে খানখান হয়ে যাবে! ওমন শঙ্কায় সঙ্কিত কানাইঘাবাসী।

আমরা স্থানীয় ও জাতীয় নেতৃত্বের কাছে, প্রশাসনের সকল সচেতন কর্মকর্তাবৃন্দের বরাবরে এ দাবীই পেশ করছি— যা জনগন চায়।

মোঘল বাদশাহরা যা করেনি, ব্রিটিশরাজত্বে যা হয়নি, পাক সরকারও যে কানাইঘাট ভাঙেনি— স্বাধীন বাংলাদেশে, গণতান্ত্রিক যুগে আপনারা তা করবেন না।