সর্বশেষ
|
প্রকাশ: মঙ্গলবার, আপডেট : ২৪ ডিসে ২০১৯ ০১:১২ ঘণ্টা

রূপকথার রাজ্য সিলেটের জাফলং

মুয়াজ বিন এনামঃ একদিকে খাসিয়া জৈন্তা পাহাড়, অন্যদিকে নদী। পাহাড়ের বুকচিড়ে বয়ে চলছে ঝরনা, আর স্বচ্ছ নদীর পানিতে স্তরে স্তরে সাজানো নানা রঙের নুড়ি পাথর। দূর থেকে দেখলে মনে হবে আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে বুক টান করে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে নরম তুলার মতো ভেসে বেড়াচ্ছে সাদাকালো মেঘরাশি। পর্যটকদের মন কাড়তে এর বিকল্প আর কী হতে পারে?
ভ্রমণ পিপাসুদের প্রাণের খোরাক সিলেটের জাফলং। সমতল চা-বাগান, খাসিয়া পল্লী, পানের বরজ আর সুস্বাদু কমলা বাগানের জাফলংকে প্রকৃতি যেন নিজ হাতে সাজিয়েছে।জাফলংয়ের সৌন্দর্য দেখতে তাই প্রতি বছর প্রচুরসংখ্যক পর্যটক ভিড় করেন সেখানে। ঋতু- বৈচিত্র্যের সঙ্গে জাফলংও তার রূপ বদলায়। সৌন্দর্যে আসে বৈচিত্র্যতা। বর্ষায় দেখা যায় পাহাড় থেকে নেমে আসা সাদা সুঁতোর মতো ঝরনা। সবুজের বুকে নেমে আসা ঝরনাধারায় সূর্যের আলোর ঝিলিক ও পাহাড়ে ভেসে বেড়ানো মেঘমালা মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে পর্যটকদের। আবার শীতে অন্য রূপে হাজির হয় জাফলং। সবুজে ছেয়ে যায় পাহাড়চূড়ার গহীন অরণ্য। ফলে শীত এবং বর্ষা যেকোনো মৌসুমেই বেড়ানোর জন্য পর্যটকরা বেছে নেন সিলেটের জাফলংকে।

জাফলংয়ের বুক চিড়ে বয়ে গেছে ধলাই ও পিয়াইন নদী। এ নদী দুটি অনন্যতা এনে দিয়েছে জাফলংকে। ধলাই ও পিয়াইনের স্বচ্ছ জলে দল বেঁধে ঘুরে বেড়ায় নানা জাতের ছোট ছোট মাছ। পানির নিচ থেকে ডুব দিয়ে হাজার হাজার শ্রমিকের পাথর উত্তোলনের দৃশ্যও মুগ্ধ করে পর্যটকদের। নদীর পানিতে নারী-পুরুষের এই ‘ডুবোখেলা’ দেখা যায় ভোর থেকে সন্ধ্যা অবধি। সীমান্তের ওপাড়ে ডাউকি নদীর ওপরে দুই পাহাড়ের মধ্যখানের ঝুলন্ত সেতু বাড়িয়ে দিয়েছে জাফলংয়ের সৌন্দর্য।
জাফলংয়ের সৌন্দর্যে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে সেখানকার আদিবাসীদের জীবনধারা। নদী পার হলেই খাসিয়াপুঞ্জি। খাসিয়াদের গ্রামকে বলা হয় পুঞ্জি। পুঞ্জিগুলোতে দেখা যায় ৩-৪ ফুট উঁচুতে বিশেষভাবে তৈরি খাসিয়াদের ঘর। প্রতিটি বাড়িতে সৃজিত পানবরজ। মাতৃতান্ত্রিক খাসিয়া সম্প্রদায়ের পুরুষরা গাছ বেয়ে বরজ থেকে পান পাতা সংগ্রহ করেন। আর বাড়ির উঠোনে বসে নারীরা পান পাতা ভাঁজ করে খাঁচা ভর্তি করেন বিক্রির জন্য।
পানবরজ ছাড়াও খাসিয়া পল্লীতে আরও দেখা যায় কমলা বাগান। কাঁচা-পাকা কমলায় নুয়ে আছে বাগানের গাছগুলো। সংগ্রামপুঞ্জির রাস্তা ধরে আরেকটু এগুলোই দেখা যায় দেশের প্রথম সমতল চা বাগান। পান পাতা সংগ্রহ ও খাঁচা ভর্তি করার অভিনব দৃশ্য, কমলা বাগানের কাঁচা-পাকা কমলা আর সমতল চা বাগান ভ্রমণ পিপাসুদের মন কাড়ে নিমিষেই।
পাহাড়, পানি, পান, কমলা, পাথর, ঝরনা সব মিলিয়ে জাফলং এক রূপকথার রাজ্য। নাগরিক জঞ্জাল আর কোলাহল ছেড়ে শান্তি খুঁজে নিতে তাই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে, এমনকি দেশের বাইরে থেকেও দল বেঁধে জাফলংয়ে বেড়াতে আসেন পর্যটকরা। ভাড়া করা নৌকায় পিয়াইন ও ধলাইর বুকে ভেসে বেড়ান সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। আবাসন আর যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতি হলে অল্পদিনেই জাফলং দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে প্রধান পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে একক আধিপত্য বিস্তার করবে।

লেখক : ছড়াকার ও সংস্কৃতিকর্মী, সিলেট