সর্বশেষ
|
প্রকাশ: সোমবার, আপডেট : ০৯ ডিসে ২০১৯ ০৭:১২ ঘণ্টা

জৈন্তা অঞ্চলে হিফজুল কোরআন পরিক্রমা | পর্ব-০১

সরওয়ার ফারুকী: দু’শো বছরের ব্রিটিশ রাজত্বে উপমহাদেশের ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা চুরমার হয়ে যায়, রাজার জাতি ভিখারিতে পরিণত হয়। বিপর্যস্ত এ অবস্থা থেকে উত্তরণের পয়লা চেষ্টা করেন উলামায়ে কেরাম। খেয়ে না-খেয়ে, ঘর-সংসার ছেড়ে উম্মাহকে উদ্ধারের জন্যে ঝাঁপিয়ে পড়েন তারা।
১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে শাহজালাল (রহ.)-এর আগমনের কয়েকশো বছর পর জৈন্তায় ইসলামের আগমন। আশ্চর্যজনকভাবে সুবিশাল ভারতের মধ্যে বৃহত্তর জৈন্তায় ইসলামের আগমন অনেক দেরিতে। সময়ের পরিক্রমায় জৈন্তা অঞ্চল আজ ইসলাম ও মুসলিম অধ্যুষিত।
১৮৭০-র দশক থেকে প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রায় জৈন্তার অংশগ্রহণ এবং দ্রুততম সময়ে ইসলামী শিক্ষায় বাংলাদেশের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে জৈন্তা নিজেকে প্রস্ফুটিত করে। ১৮৭৮ সালে ঝিঙাবাড়ি আলিয়া মাদ্রাসা, ১৮৭৯ সালে জামেয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম হেমু, ১৮৯৮ সালে উমরগঞ্জ ইমদাদুল উলুম, ১৯০১ সালে গাছবাড়ি জামেউল উলুম মাদ্রাসা-সহ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা-আন্দোলনে নবজাগরণের সৃষ্টি হয়। দিল্লি-ইউ.পি-কলকাতা ফেরত একদল তরুণ আলেমের আত্মত্যাগ এ অঞ্চলের মনোজগত গঠনে অসামান্য অবদান রাখে। ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠতম প্রতিষ্ঠানে সর্বোচ্চ ফলাফল করেও সে-সকল প্রতিষ্ঠানে চাকুরীর লোভনীয় প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে আপন কওমের বুকে ফিরে আসেন তারা। শিক্ষার সর্বোচ্চ স্তরে শিক্ষকতার যোগ্যতা থাকা সত্বেও তারা নিজ এলাকায় মক্তব প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেখানেই পাঠ দান করতে থাকেন। মাওলানা আবদুল আযীজ পাকিস্তান সরকারের মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব উপেক্ষা করে গ্রামের মাদ্রাসায় খেদমতের নিয়তে পড়ে থাকেন, মাওলানা ইসমাঈল ইলম (রহ.), আল্লামা মোশাহিদ (র.), ইবরাহিম তশ্না (র.), গোল্ড মেডেল জয়ী মাওলানা নিছার আলী-সহ ভারতখ্যাত অনেক আলেমেদ্বীন প্রত্যন্ত অঞ্চলে পড়ে থাকেন। তাদের ত্যাগের ফলশ্রুতিতে এসকল মাদ্রাসা বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে ব্যাপক প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়। মাওলানা নুর উদ্দিন গহরপুরি (রহ.) কানাইঘাট নামের সাথে ‘শরিফ’ শব্দ যুক্ত করে ‘কানাইঘাট শরীফ’ বলে সম্বোধন করতেন, দেলওয়ার হোসেই সাঈদি বলতেন ‘উলামাগঞ্জ’। এভাবে প্রাজ্ঞ সমাজের সম্মান ও সমীহ আদায়ে সক্ষম হয় জৈন্তা-কানাইঘাট।

হিফজুল কোরআন পরিক্রমাঃ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাক্রমের শুরুতে জৈন্তা অঞ্চলে কোনো হাফেজে কোরআন ছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় নি। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক প্রচেষ্টায় কোরআন শেখা ও জরুরি মাসায়েল চর্চার মধ্যেই বৃত্তবন্দী ছিল সাধারণ-সমাজ। কয়েকটি সুরা জানা লোককেও অনেকে ‘হাফিজ সাব’ বলে সম্বোধন করতেন। ১৯২০ সালে হাফেজ মোনাওর হিফজ সম্পন্ন করে বাড়ি ফিরলে অনেকেই আশ্চর্যান্বিত হন। খেয়াঘাটের মাঝি তাঁকে লক্ষ্য করে বলে ‘আফনারার গাউত কে বলে আস্তা কুরান-শরিফ ইয়াদ করিলাইছে’! কোরআন হিফজের খবরে সে বিস্মিত হয়। হাফেজ মোনাওর তখন আনন্দ মিশ্রিত স্বরে বলেন ‘তুমি যদি কোরআন শরীফ হাতে লইয়া বও, তাঅইলে আমি নিজে তোমারে পুরা কোরআন হুনাইতে পারমু’! কথোপকথন তৎকালীন সময়ের এক চমৎকার দলীল। ১৯২০ সালের দিকে মাওলানা আব্দুল আজিজ (রহ.) হিফজের শিক্ষক না পেয়ে মাদ্রাসা-শিক্ষক মাওলানা ইব্রাহীম (র.)-এর নিকট হিফজের সবক আরম্ভ ও সমাপ্ত করেন। সেসময় কেউ কোরআন হিফজ করে বাড়ি ফিরলে নানা স্থান থেকে লোকজন দেখতে আসত, জমায়েত হয়ে হাফিজের তেলাওয়াত শুনতো, মানুষ তাদেরকে সোনার মতো কদর করত, অত্যধিক সম্মান করত।
হাফেজদের অনুপস্থিতির জন্যে রমজান মাসে তখনও খতম তারাবিহের প্রচলন হয় নি। সকল মসজিদেই সুরা তারাবিহ হতো। জৈন্তা নয়াগ্রামের হাফেজ আব্দুল মজিদ (রহ.) ১৯১০-এর দিকে দেশে ফিরলে চারদিকে তাঁর নামডাক ছড়িয়ে পড়ে। এবং তিনপাড়া বড় মসজিদে খতম তারাবিহ পড়িয়ে জৈন্তা অঞ্চলে নতুন দিগন্তের উদ্বোধন করেন। হাফিজ মোনাওর সাতবাক ঈদগাহ মসজিদে খতম তারাবিহ পড়ানো শুরু করলে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এসে ভীড় করে, এমনকি ইফতার ও সেহরির জন্য টিফিন-বক্সে খাবার নিয়ে আসতেন। মসজিদ উপচে চত্তরেও স্থান সংকুলান হতো না। ১৯৩০/৪০-এর দশকে হাফিজ এহসান উল্লাহ রমজান মাসের ৩দশকে তিনটি বড় মসজিদে তারাবিহ পড়াতেন। ১ম দশকে কানাইঘাটের ভাটিদিহি গ্রামে, ২য় দশক বড়দেশে এবং ৩য় দশক জৈন্তায় দরবস্ত জামে মসজিদে তারাবিহ পড়িয়ে জন-হৃদয় প্রফুল্ল করতেন। ৮৫বছর বয়স্ক উমরপুরের হাফেজ উমর আলী বলেন ‘আমরা এক মসজিদে তারাবিহ পড়াতে পারতাম না, আমাদেরকে ৩দশকে তিনটি মসজিদে তারাবিহ পড়াতে হতো। সাধারণ মানুষের চাপ উপেক্ষা করা যেতো না’। দারুল উলুম কানাইঘাট মাদ্রাসার ৮২বছর বয়স্ক প্রবীণ আলেম মাওলানা আবদুল হক বলেন ‘পাকিস্থান আমলের প্রথম দিকে মাওলানা ইয়াকুব আলী-র অনুরোধে তার ছাত্র হাফিজ মাহমুদ আলী আমাদের গ্রামে এসে তারাবিহ পড়ান। সে বছর তারাবিহ নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ছিল আমাদের গ্রামে। বলা হত; ফার্সি ভাষার উপর সিলেট অঞ্চলে মাওলানা ইয়াকুব আলী (রহ.)-এর চেয়ে বড় কোনো আলেম নেই’। গাছবাড়ি জামেউল উলুম কামিল মাদ্রাসার সাবেক প্রিন্সিপাল মাওলানা আব্দুর রহিমও মাওলানা ইয়াকুব সম্পর্কে একই অভিমত পেশ করেন।
৬০-এর দশক থেকে একটি স্বাভাবিক অবস্থা তৈরি হয়। মাদ্রাসা এবং ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার ফলশ্রুতিতে হাফেজে কোরআনের সংখ্যা স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে আসে, বর্তমানে সারা বিশ্বেই হিফজুল-কোরআনের সংখ্যা সর্বকালের রেকর্ড অতিক্রম করেছে।
জৈন্তা-কানাইঘাট অঞ্চলে মূলত তিনটি ধারায় হিফজুল কোরআন ব্যাপকতা লাভ করে। শুধু জৈন্তায় নয়, সিলেট জেলার প্রতিষ্ঠিত অনেক মাদ্রাসাতেই হিফজ শাখা চালু হয় এ ধারায় প্রস্ফুটিত হাফেজদের মাধ্যমে।
১ম ধারাঃ হাফিজ ক্বারী আব্দুল মজিদ ও তাঁর ধারা।
২য় ধারাঃ হাফেজ ক্বারী আব্দুল হাই, হাফিজ মাহমুদ আলী ও তাদের ধারা (এ ধারাটাই অধিক প্রভাবশালী)।
৩য় ধারাঃ হাফেজ মোনাওর ও তাঁর ধারা।

১ম ধারাঃ হাফেজ ক্বারী আব্দুল মজিদ (রহ.) ১৮৭২ সালে জৈন্তাপুরের নয়াগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কৈশোরে তিনি দুঃসাহসী এক সিদ্ধান্ত নেন। তার ভাবনাতে উদয় হয় তিনি কোরআন হিফজ করবেন। অথচ তার আশেপাশে উস্তাদ হবার মতো কেউ নেই! তবুও তিনি নিরাশ হন নি, আল্লাহর উপর বিশ্বাস রেখে, মায়ের অনুমতি নিয়ে সুদূর ভারতের দেওবন্দে পাড়ি দেন। সেই যে গেলেন, আর কোনো খবর নেই! চিটিপত্রের যোগাযোগও সহজতর ছিল না। আব্দুল মজিদ দেশের খবর হঠাৎ হঠাৎ পেলেও মা-বাবা তার কোনো খবর জানতেন না। এভাবে দীর্ঘ আঠারো বছর পর ১৯০৭ সালে তিনি দেশের উদ্দেশ্যে পথ ধরেন। প্রথমে এসে ওঠেন মামার বাড়ি হরিপুরে। পাগলা আহমদ নামে পরিচিত ছোট মামাকে নিয়ে রাতে নিজ বাড়িতে এলে প্রথম সাক্ষাতে কেউই তাকে চিনেন নি, এমনকি সহজসরল মা-ও চিনতে ভুল করলেন! আব্দুল মজিদ ততদিনে কোরআনে হাফিজ এবং পূর্ণ জোয়ান, ছত্রিশ বছরের সুপুরুষ। দেশে ফিরার সাথেসাথেই হাফিজ আব্দুল মজিদের কোরআন হিফজের খবর ছাড়িয়ে পড়ে, লোকজন দেখতে আসে। হাফিজ আব্দুল মজিদ ১৯০৮ সালে গ্রামের মসজিদে মক্তবের পাশাপাশি হিফজ বিভাগ চালু করেন, জৈন্তা অঞ্চলে এটাই হিফজুল কোরআনের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক প্রচেষ্ঠা। কয়েক বছর মসজিদে মক্তব ও হিফয পরিচালনার পর হেমু মাদ্রাসায় হিফজ বিভাগের জন্য তাঁকে আহবান করা হয়। হেমু মাদ্রাসা তখন প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে গেছে, তাই হাফিজ আব্দুল মজিদ হেমু মাদ্রাসায় চলে আসেন এবং তার মাধ্যমে দারুল উলুম হেমু মাদ্রাসায় হিফজ বিভাগ উদ্বোধন হয়। হেমু মাদ্রাসায় হিফজের পাশাপাশি জনাব আব্দুল করিম খানের অনুরোধে তিনি তিনপাড়া বড় মসজিদে রমজান মাসে খতম তারাবিহ পড়ান।
হাফিজ আব্দুল মজিদ জীবনের শেষাংশে দীর্ঘ সময় অন্ধ ছিলেন। অন্ধত্বের প্রশ্নে তিনি বলেন ‘ছাত্রাবস্থায় গভীর রাত পর্যন্ত পড়ার নিয়তে চোখে সরিষার তৈল মালিশ করতাম। এভাবে দীর্ঘদিন সরিষার ঝাঁজ লাগানোর ফলে হয়তো অল্প বয়সে চোখের জ্যোতি নিভে গেছে’। তিনি সুদীর্ঘ হায়াত লাভ করেন। প্রায় ১১৮বছর বয়সে তার পরিবর্তিত বাড়ি গোয়াইনঘাটের গৌরিপুরে ১৯৮৭ সালে ইন্তেকাল করেন। ইন্তেকালের আগে রেখে যান হিফজুল কোরআনের একটি প্রবাহমান ধারা যা অদ্যাবধি প্রবাহিত।
তার উল্লেখযোগ্য ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম- হাফিজ আইয়ুব আলী, বেলোপাড়া/ হাফিজ তৈয়ব আলী, নিহাইন/ হাফিজ খলিলুর রহমান, হাউদপাড়া।

১৯৩৩ঃ হাফিজ আব্দুল মজিদের অন্যতম ছাত্র জৈন্তাপুরের নিহাইন গ্রামের হাফিজ তৈয়ব আলী। তিনি ১৯০৫ সালে নিহাইন গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং পঁচিশ বছর বয়সে হিফজ সম্পন্ন করেন। গ্রামের গুণীজনের পরামর্শ ও নিজ উদ্যোমে ১৯৩৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন নিহাইন হাফিজিয়া মাদ্রাসা। তিনি নিজেই হিফজের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং তার হাতে অনেক খ্যাতিমান হাফিজে কোরআনের জন্ম হয়। হাফিজ তৈয়ব আলী আশি বছর বয়সে ১৯৮৫ সালের বাইশে সেপ্টেম্বর ইন্তেকাল করেন। তিনিও জীবনের শেষাংশের দীর্ঘ সময় তিনি অন্ধ ছিলেন।

১৯৪০ঃ হাফিজ আব্দুল মজিদ-এর ছাত্র হাফিজ আব্দুল গফুর ১৯৪০ সালে খরিলহাট মাদ্রাসায় হিফজ বিভাগের উদ্বোধন করেন। হাফিজ আব্দুল গফুর দুটো ধারারই প্রতিনিধিত্ব করেন। কারণ, তিনি ক্বারী হাফিজ আব্দুল মজিদ ছাড়াও হাফিজ আব্দুল হাই-এর কাছে দাওরা দেন। সে-সূত্রে দুটো ধারাই তার মধ্যে প্রবাহমান। খরিলহাট মাদ্রাসায় তিনি একাধারে ত্রিশ বছর শিক্ষকতা করেন এবং স্বাধীনতা যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে কিছুদিন বাড়িতে অবসরের পর ১৯৭২ সালে মৃত্যুবরণ করেন। (চলবে)