|

সিলেটের গর্ব এবং অহংকার ড. মুহাম্মদ মুজাম্মিল আলী

ইমদাদুল হক যুবায়ের: 

বাংলাদেশের প্রথম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি), কুষ্টিয়া। ২০০৫-২০০৬ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হয়েছিলাম থিউলজি ফ্যাকাল্টির আল-হাদীস এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে। নিজ বিভাগ সিলেট থেকে যখন দেশের উত্তর বঙ্গের মতো বহুদূরের এক মহা বিদ্যাপউঠে ভর্তি হই তখন মনের মধ্যে অজানা এক আতঙ্ক কাজ করছিল। নতুন জায়গা আর নতুন পরিবেশ।

ইবিতে অবস্থানরত বৃহত্তর সিলেট বিভাগের শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল “জালালাবাদ ছাত্র কল্যাণ সমিতি” নামক একটি ছাত্র কল্যাণমূলক সংগঠন। আমরা যারা নতুন ভর্তি হয়েছি তাদের বরণ করার জন্য সেই সময় নবীন বরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল সংগঠনটি। সে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন উক্ত সংগঠনের প্রধান উপদেষ্টা বরেণ্য শিক্ষাবিদ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি), কুষ্টিয়ার আল-হাদীস এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মুজাম্মিল আলী।

অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মুজাম্মিল আলী স্যার যিনি আমাদের সিলেটের গর্ব এবং অহংকার। তিনি ছিলেন আমার নিজের ভর্তি হওয়া আল-হাদীস এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক এবং তৎকালীন সময়ের বিভাগীয় প্রধান। সেদিন ‘জালালাবাদ ছাত্র কল্যাণ সমিতি’ আয়োজিত অনুষ্ঠানে আমার সিলেটের সেই স্যারের হাস্যোজ্বল চেহারা দেখে আমার মতো অনেকেরই দূর হয়েছিল মনের সকল শঙ্কা ও ভীতি। অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম সেদিনকার তাঁর প্রদত্ত উৎসাহমূলক বক্তব্যের দ্বারা; যা আজো আমাকে নিভৃত্তে কাঁদায়।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-হাদীস বিভাগের অধীনে “আল-হাদীসের আলোকে নারীর ক্ষমতায়ন: একটি পর্যালোচনা” শিরোনামে আমার এম.ফিল রেজিস্ট্রেশন হয়। অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মুজাম্মিল আলী স্যার; যিনি ছিলেন আমার এম.ফিল গবেষণাকর্মের তত্ত্বাবধায়ক, যিনি তাঁর প্রগাঢ় পা-িত্ব, জ্ঞানগর্ভ দিক নির্দেশনা, তথ্য-উপাত্ত ও ¯েœহ দিয়ে এ গবেষণাকর্মে আমাকে সার্বক্ষণিক অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিলেন। যিনি গবেষণা কর্মের প্রতিটি অধ্যায়ের ক্রটি-বিচ্যুতি ধরিয়ে দিয়ে পরিমার্জনের মাধ্যমে পূর্ণ গবেষণা সম্পাদনে সুচিন্তিত পরামর্শ ও মত প্রদানসহ মূল্যবান সময় ও শ্রম দিয়ে সহায়তা করেছিলেন। যা আজ শুধুই স্মৃতি।

দীর্ঘ প্রায় আড়াই বছর অসুস্থ থাকার পর সবাইকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে শনিবার ১৬ নভেম্বর, ২০১৯ সকাল ১১.৪৫ মিনিটে কুষ্টিয়ার নিজ বাসায় মহান রবের ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেলেন- বহু গ্রন্থ প্রণেতা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মুজাম্মিল আলী স্যার। চলে গেলেন বাংলাদেশের একজন কিংবদন্তি ইসলামী চিন্তাবিদ, লেখক ও গবেষক। চলে গেলেন সকলের প্রিয় স্বনামধন্য অধ্যাপক, ন¤্র অহংকারহীন এক বিশিষ্ট ইসলামী প-িত।

অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মুজাম্মিল আলী স্যার আনুমানিক ১ লা মার্চ, ১৯৬৩ সালে সিলেট জেলার, কানাইঘাট উপজেলার ৮ নং ঝিংগাবাড়ী ইউনিয়নের বাঁশবাড়ী গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মরহুম আব্দুল জলীল ও মাতার নাম মরহুমা ফুলজান বিবি। তাঁর পিতামহ ছিলেন ভারত উপমহাদেশের বিশিষ্ট হাদীসবেত্তা মাওলানা নজির হুসাইন দেহলভির (রহ.) এর একজন বিশিষ্ট ছাত্র মরহুম মাওলানা মুহাম্মদ তাহের সিলেটী। তাঁর নিজ দাদা র্কতৃক প্রতিষ্ঠিত বাঁশবাড়ি তাহিরিয়া মাদরাসায় দাখিল পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। অত:পর ঐতিহ্যবাহী গাছবাড়ী জামিউল উলুম আলীয়া মাদরাসা থেকে কৃতিত্বের সাথে দাখিল, আলিম ও ফাযিল পরীক্ষায় উক্তীর্ণ হন।

পরবর্তীতে, ১৯৮৩ সনে ঐতিহ্যবাহী মাদরাসা-ই আলীয়া ঢাকা থেকে কামিল (মুহাদ্দিস) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে চতুর্থ স্থান অর্জন করেন। ১৯৮৯ সনে ওহীর অবতরণ স্থানে অবস্থিত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় মদিনা থেকে শরীয়ার উপর লিসান্স ডিগ্রি লাভ করেন।

১৯৯০ সনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আরবি বিভাগ থেকে এম.এ পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। চাকুরী জীবনে তিনি সৌদি আরব থেকে ফিরে আসার পর কিছুদিন দায়ী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৪ সনে দারুল ইহ্সান বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি ভাষা শিক্ষা ইন্সষ্টিটিউটে প্রভাষক পদে যোগদান করেন। ১৯৯৫ সনে বর্তমান কর্মস্থল ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়ার আল-হাদীস এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে প্রভাষক পদে যোগদান করেন।

উক্ত বিভাগের অধীনে “বাংলাদেশের মুসলিম সমাজে শিরক ও বেদআত: একটি সমীক্ষা” বিষয়ে সম্পূর্ণ আরবি ভাষায়” পিএইচ.ডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ইতোমধ্যে তাঁর অনেকগুলো গবেষণামূলক প্রবন্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালসহ অন্যান্য মাসিক ও জাতীয় দৈনিক এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর লেখাসমূহ মৌলিক ও গবেষণামূলক হওয়ায় জ্ঞানপিপাসু মহলে বেশ চাহিদা রয়েছে।

তিনি ইসলামের বিভিন্ন বিষয় সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষায় উপস্থাপন করতেন। শতাধিক ছাত্র-ছাত্রী তাঁর গভীর পা-িত্বপূর্ণ তত্ত্বাবধানে লাভ করেছে এম.ফিল এবং পিএইচ.ডি ডিগ্রি। আমি তাঁর সরাসরি ছাত্র হওয়ার সুবাদে দেখেছি যে, তিনি শিরক, বিদআত, সুন্নাতের গুরুত্ব ও সুন্নাহ অনুসরণ, বান্দার হক আত্মীয়তার হক, সমকালীন প্রসঙ্গ, সামাজিক ও পারিবারিক বিষয়সহ অন্যান্য সমাজ ও জীবন ঘনিষ্ঠ প্রয়োজনীয় বিষয় সহজ ও সাবলীলভাবে আলোচনা করতেন।

এছাড়া সাধারণ মানুষের ইসলামী জ্ঞান লাভ সহজ করার লক্ষ্যে বাংলা ভাষায় ধর্মীয় বই-পুস্তক রচনা করেছেন। তিনি অসংখ্য অনুবাদ, ব্যাখ্যা ও গবেষণামূলক মৌলিক গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর লিখিত রচনা সামগ্রীর মধ্যে অন্যতম হলো- (১) কুরআন ও সুন্নাতের দিকে ফিরে চলো, (২) কুরআন ও হাদীসের আলোকে দ্বীন প্রতিষ্ঠায় মুসলমানদের করণীয়, (৩) ইসলাম ও আধুনিকতা, (৪) অনুসরণ, অনুকরণ ও তাক্বলীদ: বৈধ সীমারেখাসহ অসংখ্য গবেষণা প্রবন্ধ; যা পাঠক সমাজে খুবই সমাদৃত।

অত্যন্ত ন¤্র ও বিনয়ী স্বভাবের কারণে তিনি বিভাগের শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে সম্মান ও মর্যাদার মহান আসন লাভ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সে আসন শূন্য করে প্রশান্ত আত্মা নিয়ে ফিরে গেলেন মহান রবের সান্নিধ্যে। একদিন বিদায় সবাইকেই নিতে হবে এ ধরণী থেকে। সে ধারাবাহিকতায় স্যারও বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু রেখে গেছেন স্ত্রী, ১ ছেলে, ৪ মেয়ে, অসংখ্য গুণগ্রাহীসহ হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রী আর ইলমের দ্বীনের খেদমতের মতো সদকায়ে জারিয়া।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-“মানুষ মৃত্যুবরণ করলে তার যাবতীয় আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে ৩টি আমলে সওয়াব বন্ধ হয় না- (১) সদকায়ে জারিয়া (২) এমন জ্ঞান-যারা দ্বারা উপকৃত হওয়া যায় (৩) এমন নেক সন্তান-যে তার জন্য দোয়া করে।” (সহিহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৩১০)

নিশ্চিতভাবে মুমিন বান্দাদের ঐ নেক কাজগুলো মৃত্যুর পরও তার আমালনামায় নেকী যোগ করবে। মহান রাব্বে কারীমের নিকট আকুতি আর মিনতি তিনি যেন তাঁর এ মুখলিস বান্দার দ্বীনের এ মহান খেদমত ও লেখনীকে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে কবুল করেন। এর বিনিময় দান করেন। জান্নাতুল ফিরদাউসের মেহমান বানিয়ে দেন। কঠিন কিয়ামতের ময়দানে তাঁকে আরশের ছায়ায় স্থান করে দেন। ভুলক্রটি থাকলে ক্ষমা করে দেন। শোক সন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের ধৈর্য ধারণের তৌফিক দেন। আমিন।

লেখক : শিক্ষক, এম.ফিল গবেষক, প্রাবন্ধিক।