সর্বশেষ
|
প্রকাশ: বুধবার, আপডেট : ১৯ সেপ্টে ২০১৮ ১১:০৯ ঘণ্টা

গীতিকবি আবু তাহের বেলাল: গান-কবিতায় বিশ্বাসের সুরধ্বনি

শাহজাহান শাহেদঃ “হাজার গানের মাঝে একটি গানও যদি/আল্লাহর কাছে প্রিয় হয়/সেইতো খুশির কথা, সেইতো সফলতা/চাওয়া-পাওয়া আর কিছু নয়…”

নব্বই দশকে ছড়া-কবিতা আর শুদ্ধধারার গানে স্ব-মহিমায় উদ্ভাসিত একনাম গীতিকবি আবু তাহের বেলাল। নির্মোহ নিরহংকারে আচ্ছাদিত এক নির্মল হৃদয়ের প্রতিচ্ছবি। সুবহে সাদেকের কবি আবু তাহের বেলালের গান-কবিতায় প্রস্ফুটিত হয়েছে তাওহীদি ঝংকার, ঐশী হেরার পয়গাম, রাসুলের ভালোবাসা, স্বদেশপ্রেম আর মানবতার জয়গান।
উনসত্তুরের ২১ মার্চ প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন অধ্যুষিত জেলা সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার চুনা নদীর তীরে গড়ে ওঠা বুড়িগোয়ালিনী গ্রামে পৈত্রিক নিবাসে কবি জন্মগ্রহণ করেন।
তিনি স্কুল আঙিনা পেরিয়ে পড়াশোনার জন্য পাড়ি জমান রাজধানী ঢাকার অদূরে অবস্থিত মেঘনার তীরবর্তী জেলা নরসিংদীতে। সেখানকার প্রখ্যাত বিদ্যাপীঠ জামেয়া ক্বাসেমিয়ায় পড়ালেখা করে মাদরাসা শিক্ষার সর্বোচ্চ ডিগ্রী অর্জনের পাশাপাশি প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে মেধাবৃত্তিসহ স্নাতক সম্মান ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
কবি ১৯৯৫ সালে শিক্ষকতা পেশা গ্রহণ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন নরসিংদী জেলার সিরাজনগরের উম্মুলকুরায় বাংলা বিষয়ের প্রভাষক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে। অত:পর ১৯৯৮ থেকে ২০০১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সলিমগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০০১ থেকে ২০০৪ সালের ৩০ মার্চ পর্যন্ত নরসিংদী জেলার মাধবদী মহাবিদ্যালয়ের বাংলা প্রভাষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মাধবদী কলেজে কর্মরত অবস্থায় কবি ‘নরসিংদী মডেল কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে শিক্ষা বিস্তারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। ২০০৪ সালের ৩১ মার্চ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী রেজিস্ট্রার পদে যোগদান করে শিক্ষাক্ষেত্রে সুনামের সহিত অবদান রাখেন। ২০০৬ সালে তার একক উদ্যোগে নরসিংদী জেলা সদরের প্রাণকেন্দ্রে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ন্যাশনাল কলেজ অব এডুকেশন’ নামে আরেকটি ব্যতিক্রমী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এই কলেজেরও তিনি প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।
কবি আবু তাহের বেলাল লেখালেখির আঙিনায় প্রবেশ করেন ১৯৮৬ সালের দিকে। নরসিংদীর জামেয়া ক্বাসেমিয়ার দেয়ালিকা সম্পাদনার মাধ্যমে তার সাহিত্য সাধনা শুরু। ৮৬ সালেই তার প্রথম লেখা ‘মাসিক ফুলকুঁড়ি’ পত্রিকাতে প্রকাশিত হয়। তারপর বিভিন্ন দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক পত্রিকা ও সাময়িকীতে তার নিয়মিত ছড়া-কবিতা প্রকাশ হলেও গ্রন্থ প্রকাশে তিনি সবসময় বিমুখ ছিলেন। ১৯৯২ সালে কবির শিশুতোষ গ্রন্থ ‘শিশুর মুখে ফুলের হাসি’ প্রকাশিত হবার পর আর কোন গ্রন্থ প্রকাশ হয়নি। যদিও কবির সংগ্রহে যেসব মানসম্পন্ন ছড়া-কবিতা ও গানের ভান্ডার রয়েছে তা দিয়ে চৌদ্দ/পনেরোটি গ্রন্থ অনায়াসে প্রকাশ করা সম্ভব। যা প্রকাশ হলে নিঃসন্দেহে বাংলা সাহিত্যভান্ডার সমৃদ্ধ হবে এবং সাহিত্যানুরাগীদের নতুন খোরাক হবে।
বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারের তালিকাভুক্ত গীতিকার কবি আবু তাহের বেলাল অসংখ্য কালজয়ী গানের স্রষ্টা। ইতিমধ্যে তিনি সহস্রাধিক গান রচনা করেছেন। বাংলাদেশের কিংবদন্তী সুরকার ও সংগীত পরিচালক ওস্তাদ আজাদ রহমান, সংগীত পরিচালক লোকমান হাকিম, সুরকার আলী আকবর রূপু, ওস্তাদ হরিমোহন দেবনাথ, শ্রীরাম কর্মকার, দিলীপ সাহা প্রমুখ সঙ্গীতজ্ঞরা তার গানে সুরারোপ করেছেন।
আধুনিক ও দেশের গানের পাশাপাশি ইসলামী গানের ভূবনে কবি ও গীতিকার আবু তাহের বেলাল এক অনন্য উচ্চতায় আসীন। ইসলামী গানের কিংবদন্তী শিল্পী-সুরকার মশিউর রহমানসহ জাতীয় পর্যায়ের জনপ্রিয় শিল্পীদের কন্ঠে উচ্চকিত হয়েছে এবং বর্তমানেও হচ্ছে কবি আবু তাহের বেলালের লেখা গান। তার লেখা গানের কথায় চমৎকার শব্দালংকারের কারুকার্যময় পঙক্তি গানপ্রিয় মানুষের হৃদয়ে বিরাজ করায় মোহনীয় পরশ। বাংলাদেশে ইসলামী গান রচনায় কবি মতিউর রহমান মল্লিক, ওস্তাদ তোফাজ্জল হোসাইন খানের সাথে সাথে সমস্বরে উচ্চারিত হয় গীতিকবি আবু তাহের বেলালের নাম। ইতিমধ্যে তিনি অনেক কালজয়ী ইসলামী গান উপহার দিয়েছেন, যা নিত্যদিনই উচ্চারিত হয় শিল্পী ও সংগীতানুরাগীদের ঠোঁটে ঠোঁটে। কবি গানে গানে সাজান তার স্বপ্ন-বাসনা আর চিন্তা-চেতনার বাগান। তিনি তার একটি গানে লিখেন- “পৃথিবীর হাজারো কাজের ভিড়ে/ইকামতে দ্বীনের এ কাজ যেনো/আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় হয়/আর কোনো বাসনা নেই যে আমার/কবুল করো তুমি ওগো দয়াময়…”।
সর্বকালের শ্রেষ্ঠমানব মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি প্রতিটি মুমিনের অগাধ ভালোবাসাই ঈমানের অন্যতম শর্ত। রাসুলের প্রতি কবির ভালোবাসা অপরিসীম, যার প্রমাণ তার গানে গানে প্রজ্জলিত হয়েছে। অগণিত নাতে রাসুল লিখেছেন তিনি। তিনি লিখেন- “দূর আরবের মরুর বুকে/একটি ফোটা ফুল/দীন-দুঃখীদের বন্ধু সে যে/মুহাম্মাদ রাসুল…”। তিনি আরো লিখেন- “চাঁদের চেয়ে সুন্দর তুমি/নবী আমার সাল্লেয়ালা/সুখে-দুঃখে রাসুল তোমার/প্রিয় হাবীব আল্লাহ তায়ালা…”।
আবু তাহের বেলাল একজন মানবতাবাদী কবি। তার গানের অন্তরায় বাজে মানবতার জন্য দরদ। তিনি তার এক গানে লিখেন- “রক্তে রঞ্জিত ক্ষত-বিক্ষত/প্রিয়জনের মুখ আজ যায় না চেনা/জীবন প্রদীপ ঔ নিভিয়ে দিলো/গণধিক ধৃত বর্বর হায়েনা…”। তিনি সত্য-ন্যায়ের পথে জীবন দানকারী শহীদদের বিরহে বা শূণ্যতায় কলম ধরেন এভাবে- “জানিনা আর ফুটবে কী না/এই বাগানে/মালিকের মতো কোনো ফুল…”।
কবির কাব্যে ছন্দের ঝংকার আর শব্দালঙ্কারের জ্যোতি সাহিত্যপিপাসুদের মন করে সতেজ। তিনি তার প্রকাশিতব্য কবিতার বই ‘মায়াবী পালক’ এর একটি কবিতায় বলেন- “আমার হৃদয় জুড়ে ঢেলে দাও অনন্ত আলোক/চোখের তারাতে দাও চির দ্যুতিময় দৃপ্ত জ্যোতি/অশ্রুকে বানিয়ে দাও অমূল্য প্রবাল অরুন্ধতী/সৃজনে মননে যেন ঝরে পড়ে মায়াবী পালক…”।
নির্যাতিত নিপীড়িত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতি উৎসর্গ করে মানবতাবাদী এ কবি তার ‘কবির আর্তনাদ’ কবিতায় আর্তনাদ করেন এভাবে-
“নাফ নদীর তলোদেশে আমার জননীর রক্তাক্ত বক্ষ/শত্রুর চাবুকে কর্তিত/তার থকথকে স্তনদ্বয়/ পাশে অগ্নিদগ্ধ দুগ্ধ শিশুর মস্তকহীন নিথর নিষ্প্রাণ দেহ/মাকে জড়িয়ে ধরার কী ব্যর্থ প্রচেষ্টা তার/দুচোখে এক বারও আজ দেখো না কেহ/তার কচি হাত পা নাড়িভুড়ি/নাফের লাল স্রোতধারায় কিভাবে হয় আবর্তিত…!”
কবি আবু তাহের বেলাল তার ‘বাংলা ভাষা’ কবিতায় বলেন- “ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ কৃষ্ণচূড়া বললো ডেকে/বলতে পারো আমার এফুল লাল হলো কার রক্ত মেখে/বললো পলাশ শিমুল আমায় চেয়ে দেখো স্মৃতির পাতায়/আমরা এমন রক্ত বরণ রক্ত রঙিন কবের থেকে!”

গুণী এই কবি ও গীতিকারের সাথে দুইবারের সরাসরি সাক্ষাতে কাছ থেকে দেখেছি, হীরা-মানিক চিনেছি। চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি কবি সিলেট এসেছিলেন বাংলাদেশ সংগীত কেন্দ্র সিলেট বিভাগীয় আহবায়ক কমিটি গঠনের লক্ষ্যে। ১৫ ফেব্রুয়ারি কেমুসাসের সাহিত্য আড্ডায় অতিথি হিসেবে যোগ দেন এবং পরেরদিন ১৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সংগীত কেন্দ্রের সিলেট বিভাগীয় আহবায়ক কমিটি গঠন করেন। তিনি বাংলাদেশ সংগীত কেন্দ্রের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকেরর দায়িত্বে আছেন। আবার মার্চের শেষের দিকে এসেছিলেন সংগীত কেন্দ্র সিলেট আয়োজিত স্বাধীনতা উৎসবে অতিথি হয়ে। যেখানে তার সাথে আরো এসেছিলেন প্রখ্যাত গীতিকার ও সুরকার ওস্তাদ তোফাজ্জল হোসাইন খান এবং সুরসম্রাট শিল্পী মশিউর রহমান। সংগীত কেন্দ্র’র সদস্য হিসেবে একান্তভাবে আলাপ করার সুযোগ হয়েছে। কবির কথামালা থেকে বুঝা গেলো তিনি একজন স্পষ্টবাদী মানুষ। শুদ্ধধারার সাংস্কৃতিক আন্দোলন করেন বিবেকের তাড়না থেকে। কোনো অর্থনৈতিক মোহে পড়ে নিজের পূণ্য বরবাদ করার লোক তিনি নন। গান এবং ছড়া-কবিতা লেখায় ব্যাকরণগত নিয়ম পালনে কবি খুবই কঠোর। ছন্দমিল, অন্ত্যমিল কিংবা ভাবগত দিকে অতি সতর্কতা অবলম্বন করেন। নবীন কবি-লেখকরা তার কাছে গেলে আন্তরিকতার সহিত ভুলগুলো নিখুঁতভাবে ধরে দেন এবং উত্তরণের পথ বাতলে দেন।
গীতিকবি আবু তাহের বেলালের বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক গান নিয়মিতভাবে দেশের শুদ্ধ সাংস্কৃতিকধারার জনপ্রিয় সুরকারদের সুরে এবং শিল্পীদের কন্ঠে প্রকাশিত হচ্ছে। যা সংস্কৃতি পাগল মানুষদের হৃদয়কে আলোড়িত করছে, জয় করে নিচ্ছে প্রতিদিনই। প্রকাশ বিমুখ এই কবি বই প্রকাশে বরাবরই অনাগ্রহ দেখালেও বর্তমানে সময়ের প্রয়োজনে এবং দেশ-বিদেশের ভক্তকূলের অনুরোধে বই প্রকাশের জন্য সম্মতি দিয়েছেন। আগামী বইমেলাতেই একসাথে আসছে কবির কয়েকটি বই। বইগুলো হচ্ছে- ‘মায়াবী পালক’ (কাব্যগ্রন্থ), ‘মেঘনা আমার মেঘনা’ (শিশু-কিশোর কাব্য), ‘ছন্দ শেখার পাঠশালা’ (ছন্দ বিষয়ক গ্রন্থ), ‘ব্যবচ্ছেদ’ (সাহিত্য সমালোচনা গ্রন্থ), ‘ইসলামী গান: সমস্যা ও সম্ভাবনা’।
কবি আবু তাহের বেলাল বাংলাদেশ বেতার ও বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে অনুষ্ঠান উপস্থাপনা, গ্রন্থনার সাথে জড়িত সেই ছাত্রজীবন থেকে। বাংলাদেশ বেতারের ‘মুখোমুখি’, ‘মানচিত্র’, ‘পড়াশোনা’, ‘দর্পণ’, ‘উত্তরণ’ প্রভৃতি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান সাফল্যের সাথে দীর্ঘদিন ধরে গ্রন্থনা ও উপস্থাপনার দায়িত্ব সুচারুভাবে সম্পন্ন করে আসছেন। তিনি একজন ভালো মানের আবৃত্তিকারও। ফেসবুকে কবি কর্তৃক পরিচালিত সৃজনশীল সাহিত্যগ্রুপ ‘বাংলাদেশের কবি ও কবিতা’ বেশ জনপ্রিয়। এতে তিনি নবীনদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেন, যোগ্য লেখক করে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালান। গান-কবিতার সাথে কবির গদ্যরচনার হাতও বেশ ভালো। কবির ‘ঝড় আসুক বৃষ্টি আসুক’, ‘পালাপদল’, ‘সেই ছেলে’ প্রভৃতি মঞ্চসফল নাটক।
তিন সন্তানের জনক কবি আবু তাহের বেলাল পেশায় একজন অধ্যাপক। কবির সহধর্মিনী কবি প্রতিষ্ঠিত নরসিংদীর ন্যাশনাল কলেজ অব এডুকেশনে উপাধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত আছেন।
কবির লেখনিতে দিনদিন সমৃদ্ধ হচ্ছে বাংলা সাহিত্য। গান-কবিতায় উচ্চারিত হচ্ছে বিশ্বাসের সুরধ্বনি। সে ধারা অব্যাহত থাক আমৃত্যু। সেথায় ফোটে উঠুক তাওহীদ, রিসালত, আখেরাত এবং সর্বোপরি মানবতার কল্যাণ। মানুষ খুঁজে পাক ঐশী হেরার আলোকধারা।

(লেখকঃ সংস্কৃতি ও সংবাদকর্মী, সিলেট)